রোহিঙ্গা ক্যাম্প আরসা আরএসওর অভয়ারণ্য

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের আস্তানা। সেখানে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) বিরোধ বাধে প্রায়ই। প্রতিটি ক্যাম্পের আনাচকানাচে তাদের বিচরণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনেই অবাধে চলাফেরা করছে তারা। অপহরণ থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই যে তারা করছে না। মুক্তিপণ না পেলে তারা হত্যাকান্ডও ঘটায়।

প্রায় প্রতিদিন সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত ছয় বছরে ৩৩৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অপরহরণের ঘটনার হিসাব নেই। অন্যান্য অপরাধ তো আছেই। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও আইসের চালান এনে ক্যাম্পে বিক্রি করা হয় দেদার। টাকার বদলে ডলারে বিক্রি হয় ইয়াবার চালান। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় সদস্য ইয়াবা উদ্ধারের নামে ডলার ঘুষ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গাদের অপরাধ ঠেকাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে একাধিক। তারপরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

ক্যাম্পের ভেতরে হত্যাকা-সহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা চিন্তিত। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে একাধিক বৈঠক হয়েছে। কয়েকটি এনজিওর বিষয়েও নজরদারি করছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এখন মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের আখড়া। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রায় প্রতিদিন উখিয়া-টেকনাফ, তুম্ব্রু-নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত প্রতিটি ক্যাম্পে ঢোকে ইয়াবা ও আইসের চালান। পরে ক্যাম্প থেকে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসেই সারা দেশের মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে অপরাধী রোহিঙ্গারা। মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেই গড়ে উঠেছে ক্যাম্পকেন্দ্রিক অসংখ্য সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ।

ক্যাম্পে নিজেদের আধিপত্য জিইয়ে রাখতে ও প্রত্যাবাসন-প্রক্রিয়া রুখতে ইয়াবা ও আইস বিক্রির টাকায় তারা ভারী অস্ত্র কিনছে। সন্ধ্যা হলেই স্থানীয় বাসিন্দারা সন্ত্রাসীদের ভয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস করে না। প্রায় প্রতিদিন খুনখারাবি, অপহরণ, ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাওয়ায় শরণার্থীরা এবং স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আশ্রয়শিবিরে মাদক, অস্ত্র ও সোনার চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নানা অপকর্ম চালায় আরসা ও আরএসও।

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিদিনই ক্যাম্পগুলোতে বসে মাদকের হাট। সরকারি-বেসরকারি দাতা সংস্থার সদস্যরা ক্যাম্প ছাড়লেই রোহিঙ্গা মাদক কারবারিরা সক্রিয় হয়। দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকলেও রাতে অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ে। রাত গভীর হতে থাকলে ক্যাম্পগুলোতে অচেনা মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। ক্যাম্পে মজুদ রাখা ইয়াবা রাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। ইয়াবা ও আইস বদলে দিয়েছে রোহিঙ্গাদের জীবন। ক্যাম্পের ভেতরে গড়ে ওঠা দোকানগুলোই মাদক লেনদেনের কেন্দ্র। ওই সব দোকানের আড়ালে মাদকের কারবার পরিচালিত হয়।

ক্যাম্পে অধিক পরিচিত সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে রয়েছে মাস্টার মুন্না গ্রুপ, নবী হোসেন গ্রুপ, মৌলভি ইউসুফ গ্রুপ, রকি বাহিনী, শুক্কুর বাহিনী, আব্দুল হাকিম বাহিনী, সাদ্দাম গ্রুপ, জাকির বাহিনী, পুতিয়া গ্রুপ, সালমান গ্রুপ, গিয়াস বাহিনী, মৌলভি আনাস গ্রুপ, কেফায়েত গ্রুপ, জাবু গ্রুপ, আবু শামা গ্রুপ, লেড়াইয়া গ্রুপ, খালেদ গ্রুপ, শাহ আজম গ্রুপ, ইব্রাহিম গ্রুপ ও খলিল গ্রুপ। অন্তত ২০০ গ্রুপ সক্রিয়। এসব গ্রুপকে আরসা, আল সাবা ও আল ইয়াকিন নিয়ন্ত্রণ করে।

নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন রোহিঙ্গা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিভিন্ন বড় এনজিওকে অর্থও দিতে হচ্ছে আরসাকে। না দিলে হুমকি দেওয়া হয়। আরসার সদস্যরা উখিয়া-টেকনাফের প্রতিটি ক্যাম্পে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে। এসব ক্যাম্পে দুই শতাধিক মাদ্রাসা ও হেফজখানা রয়েছে। প্রতিটি মাদ্রাসা থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। টাকা হাসিমুখে না দিলে খেসারত গুনতে হয়। চাঁদা না পেয়ে খুনের ঘটনাও ঘটাচ্ছে আরসা। রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ, বালুখালী ক্যাম্পের মাস্টার আরিফ উল্লাহ, হাফেজ শফিকুল ইসলাম, মুফতি আবদুল্লাহকে তারা হত্যা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় আরসার সদস্যরা।

ওই রোহিঙ্গারা আরও বলেন, বিকাল ৪টার পর ক্যাম্পগুলোতে নীরবতা নেমে আসে। ওই সময়ের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল থাকে না। তারাও আতঙ্কে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য আরসার মাদক কারবারে সহায়তা করছেন। বিনিময়ে তারা ডলার পান। আরসার সদস্যরা ডলারেই লেনদেন করে মিয়ানমারের সঙ্গে। রাতে তরুণীরা ঘর থেকে বের হয় না। অনেক তরুণী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের চোখের সামনে এসব অপকর্ম হচ্ছে; অথচ তারা কিছু করতে পারে না।   

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরসার প্রধান হচ্ছেন আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনী। বড় হয়েছেন মক্কায়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে হামলার প্রধান নির্দেশদাতা জুনুনী। তার সঙ্গে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সুসম্পর্ক আছে। আরসা খুনখারাবি, নারী, অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসা করছে। সন্ধ্যার পর তাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। আরসাকে  নির্মূল করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘মাদকের লেনদেনের কারণেই অধিকাংশ অপরাধ সংঘটিত হয়। মাদকের টাকা যারা নেয়, তাদের কেউ থানায় অভিযোগ করে না।’ 

হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল হুদা বলেন, ‘অপহরণ আতঙ্কে অনেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পাঠানো নিরাপদ মনে করছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেকটা নিষ্ক্রিয়। তারা অপহরণের অভিযোগ পেলেও দুর্গম পাহাড়ে অভিযানে যেতে চায় না। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এসব অপকর্ম করছে। তিন বছরে অন্তত ২৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছে। দমদমিয়া, জাদিমোরা, লেদা, আলীখালী, রঙ্গীখালী, পানখালী, কম্মুনিয়াপাড়া ও মরিচ্যঘোনা এলাকার লোকজন বেশি আতঙ্কিত।’

কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভিন্ন গ্রুপ আছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা সচেষ্ট। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। খুন, মাদক চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত অনেক রোহিঙ্গা।’