যে সব অর্থে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের, দেশহিতৈষী মানুষেরা সব সময়ই বলে থাকেন ‘শেখ হাসিনার বিকল্প নেই’। যারা এমনটি বলেন তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। বলা যায়, তারা দলনিরপেক্ষ। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে তারা আপসহীন। তারা কেন শেখ হাসিনাকে বিকল্পহীন ভেবে থাকেন, তার জবাব বহুবিধ। প্রথমত, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের দর্শন জিইয়ে রাখার জন্য শেখ হাসিনার বিকল্প কেউ নেই বলে যে দাবিটি রয়েছে তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে। তাছাড়া দেশে উন্নয়নের যে জোয়ার ঘটে গেছে, সে ধারা চলমান রাখাও শেখ হাসিনা ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ যে উঁচু অবস্থানে আসন গেড়েছে, তাও বিনষ্ট হবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে।

শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রবেশ এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের ফলে জিয়াউর রহমানের পরিকল্পিত পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, যার কারণে জিয়া আর সে পথে এগোতে পারেননি। পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জিয়া ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নির্বাসনে পাঠান, শাহ আজিজ-সহ মুখ্য রাজাকারদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দেওয়া এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের স্মৃতিবহনকারী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করেন, সংবিধান কেটে ছিঁড়ে ধর্মনিরপেক্ষতাসহ মুক্তিযুদ্ধের সব চেতনা মুছে ফেলেন। কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আযমসহ পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়া যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন। শহুদুল হক, ওয়াহিদুল হকসহ বেশ কিছু সেনা কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন যারা পরে পুলিশের এবং গোয়েন্দা বিভাগের শীর্ষ পদে পৌঁছেছিলেন। মেজর এনাম খান নামক আর এক রাজাকারকে ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক পদে নিয়োগ দেন, শর্ষিনার পীরের মতো এক জঘন্য রাজাকারকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন, সাকা চৌধুরীসহ বহু রাজাকার/যুদ্ধাপরাধীকে আর্থিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, দেশে ধর্মান্ধদের প্রতিষ্ঠিত করে সাম্প্রদায়িক হানাহানির উদ্ভব ঘটান, দালাল আইন বিলোপ করে বিচারাধীন কয়েক সহস্র রাজাকারকে মুক্তি দেন ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু যে আইন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, জিয়া তা হিমাগারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তার সময়ে বাংলা সংস্কৃতির চর্চা রুদ্ধ করা হয়েছিল।

শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াকৃত সব পাকিস্তানপন্থি পদক্ষেপ একে একে দূর করেন। পাকিস্তানি প্রভুদের নির্দেশে জিয়া বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়, সামরিক সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করে দেশের নিরাপত্তা বিঘিœত করেছিলেন। দেশ ভরে গিয়েছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই কর্তাব্যক্তিদের দ্বারা। শেখ হাসিনা সব ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আস্তানা চুরমার করেন। তিনি পৃথিবীর বহু জাদরেল নেতার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা কার্যকর করেন, সংবিধানকে ’৭২-এর অবস্থানের কাছাকাছি নিয়ে যান, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নস্যাৎ করতে বহুদূর এগিয়ে যান, বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার ক্ষমতা গ্রহণের পরেই বাংলাদেশের মাটিতে বাংলার সংস্কৃতি পুনর্জন্ম লাভ করে। বৈশাখী অনুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রচলন পায় নতুন জীবন।

অন্যদিকে জিয়া প্রতিষ্ঠিত বিএনপির সিংহভাগ সদস্যের পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজাকার শ্রেণিভুক্ত। ঐতিহাসিক সত্য হলো এই যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে সব ধর্মান্ধ দল যথা মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামের সমর্থকরা, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় যাদের বুকে রক্তক্ষরণ হয়েছিল, তারা সবাই জিয়াকে ত্রাণকর্তা হিসেবে পেয়ে তার পেছনে সারিবদ্ধ হয়েছিল। মূলত পরবর্তীকালে এদের নিয়েই বিএনপি গঠিত হয়। সঙ্গে ছিল জামায়াতে ইসলামী। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার দাবি নতুন করে উচ্চারিত হয়, যা আগে বঙ্গবন্ধু করেছিলেন, কিন্তু যে দাবি জিয়া এবং পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রী ভুলেও উচ্চারণ করেননি। শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণের পরেই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের সঙ্গে বৈরিতা দূর করা হয়। পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জিয়াউর রহমান বিভিন্ন অজুহাতে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছিলেন, যার একটি হয়েছিল ১৯৭৭ সালে একটি জাপানি বিমান হাইজ্যাকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যেটি কয়েকজন জাপানিই ঘটিয়েছিলেন, যার সঙ্গে বাংলাদেশের কারও সম্পৃক্ততা ছিল না।

অর্থনৈতিক এবং কারিগরি উন্নতির ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকার যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, তা গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছে। এমনকি পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফও দুদিন আগে আক্ষেপ করে বললেন বাংলাদেশ কতদূর এগিয়ে গেছে, আর পাকিস্তান কোন অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে। কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ, কর্ণফুলী টানেল, নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, বহু সড়ক ও সেতু নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব, মেট্রোরেল, কৃষিতে অভাবনীয় উন্নয়ন, প্রতিটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন, বহু হাসপাতাল এবং চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনা অমরত্ব লাভ করবেন। যে দূরদর্শিতা এবং দক্ষতার সঙ্গে তিনি কভিড রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য করোনার টিকা দিয়ে বহু লোককে বাঁচিয়েছেন, তা গোটা বিশ্বেই নজিরবিহীন। তার সময়েই বেশ কয়েকটি চিকিৎসা বিদ্যালয় এবং একটি চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। অতীতে বিএনপির শাসনকালে বিদ্যুৎ এবং পানীয় জলের অভাবে হাহাকার বিরাজ করত, অথচ আজ দেশের প্রান্তিক অঞ্চলেও বিদ্যুৎ সারাক্ষণ বিরাজমান। করোনা মহামারী এবং তার পরই ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে ধস নামলেও তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের অবস্থা ভালো বলাটা অত্যুক্তি হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ওবামা, জাতিসংঘের মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের নেতারা বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে সব সময়ই আখ্যায়িত করছেন। এ দেশ থেকে এখন দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা বিদায় নিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ীই চরম দারিদ্র্য অবস্থা এখন আর নেই। শেখ হাসিনা যেভাবে গৃহহীনদের গৃহায়নের ব্যবস্থা করেছেন তা উন্নয়নশীল বিশ্বে নজিরবিহীন।

মানুষের গড় আয়ু এখন অনেক বেড়েছে। মহিলাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তাদের আর্থিক এবং সামাজিক অবস্থায় ঘটেছে অভূতপূর্ব বিপ্লব, যেটিও বিশ্ববাসীর প্রশংসা অর্জন করেছে। শেখ হাসিনার শাসন আমলেই নিম্ন আদালতসমূহকে সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে হাজার হাজার বাংলাদেশি সৈন্য এবং পুলিশ আজ দক্ষতা এবং সুনামের সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন, সে ব্যাপারেও শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষ অবদান রয়েছে। বাংলাদেশি কর্মজীবীদের কর্মক্ষেত্র বহুমুখী করার যে প্রকল্প হাসিনা সরকার হাতে নিয়েছে তার ফলে আজ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে বহু দেশে বাংলাদেশি কর্মজীবীদের অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে।

যে বাংলাদেশকে এক সময় গোটা বিশ্ব অবজ্ঞা ভরে দেখত (বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত শাসনকাল ছাড়া) সে বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। জলবায়ুর ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য শেখ হাসিনা বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, যে কারণে জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক ফোরামের শীর্ষপদটি তাকে দেওয়া হয়েছে। বহু দেশ এবং গণমাধ্যম তার নেতৃত্বের এবং সাহসিকতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, যা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জন্যই গর্বের বিষয়। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে মানবতার জননী হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম, গবেষণালয় এবং সাময়িকী শেখ হাসিনাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে চিত্রিত করেছে। এসব বিবেচনায় যে কথা বলিষ্ঠভাবে বলা যায় তা হলো এই যে সব অর্থেই শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। যারা দেশের মঙ্গলে ঈর্ষান্বিত তারাই চাচ্ছেন শেখ হাসিনার পতন, কিন্তু জনগণ তাদের সঙ্গে নেই।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি