ঢাকায় জলাবদ্ধতা

সমন্বিত উদ্যোগ ও জনসচেতনতা জরুরি 

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০৮ এএম

রাজধানীতে জলাবদ্ধতা জনজীবনের জন্য ক্রমেই প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে। ১২ জুলাই ফের এরই যে চিত্র দৃশ্যমান হলো তাতে অনেক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় জলাবদ্ধতার দায় কার কতটুকু, জলাবদ্ধতায় অচল নগরজীবন, সমাধানের পথ কী, জলাবদ্ধতার দায় কি শুধুই প্রকৃতির কিংবা এত টাকা খরচ করেও জলাবদ্ধতার নিরসন কেন হলো না এমন বহু প্রশ্নই আছে যেগুলোর উত্তর দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই এড়ানোর অবকাশ নেই। ১৩ জুলাই দেশ রূপান্তরসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত সচিত্র প্রতিবেদনগুলোয় অবর্ণনীয় জনভোগান্তি ও জলজট-প্রেক্ষাপটের যে বর্ণনা মিলেছে তাতে প্রতীয়মান হয়, রাজধানীবাসীর জন্য অভিশাপ হয়ে ওঠা দুর্ভোগ লাঘবের পথ এত সহজ নয়, যদি না সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। আষাঢ়ে-শ্রাবণে বৃষ্টি হবে কিন্তু বৃষ্টি হলেই নগর-মহানগর ‘শহরের নদীতে’ রূপ নেবে আর তাতে মানুষ হাবুডুবু খাবে; এ তো হতে পারে না।   

সড়ক নামক যাতায়াত মাধ্যমটিতে স্রোতধারা বইবে, ঘরবাড়িতে পানি হানা দেবে, জীবনঝুঁকি সঙ্গী করে মানুষকে পানি ভেঙে চলতে হবে এসবও তো নগরবাসীর নিয়তি হতে পারে না। আমাদের নগরপিতারা তো বটেই, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রলালয়-বিভাগের তরফেও এই দুর্ভোগ নিরসনের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি কম শোনা যায়নি কিন্তু ভোগান্তিমুক্ত হতে পারেনি নগরবাসী। জলাবদ্ধতা প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়, তা সম্পূর্ণ মানুষের অর্থাৎ দায়িত্বশীলদের  কাজ। ধারাবাহিকভাবে নগরের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ধ্বংস করা হয়েছে, সবখানে কংক্রিটের ভবন গড়ে উঠেছে। বিখ্যাত স্কটিশ স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইয়ান ম্যাকহার্গ তার ‘ডিজাইন উইথ নেচার’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘শহরগুলোতে কংক্রিটের আধিপত্য বাড়লে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে না। তাই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য নদী, খাল ও জলাভূমি সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।’

ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে ৩০ বছর আগে ঢাকায় দুই হাজারের বেশি পুকুর ছিল। সেগুলো এখন কীভাবে ফিরে পাওয়া যাবে? রাজধানীবাসীকে অপরিকল্পিত নগরায়ণের মাশুল গুনতে হচ্ছে এবং একই সঙ্গে মনুষ্যসৃষ্ট কর্মকাণ্ড যে পরিস্থিতির উদ্ভব করেছে তা বিস্ময়কর। এখন ভারী বর্ষার পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত। এটি আসলে আমাদের এতদিনের অপরিণামদর্শী কর্মকা-ের ভয়াবহ ফল। জনসচেতনতার ঘাটতিও দুর্বিষহ পরিস্থিতির জন্য বহুলাংশে দায়ী। দখল, প্রকৃতির স্বাভাবিকতায় অভিঘাত,পলিথিনসহ যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা ইত্যাদি নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বৈরী পরিস্থিতির পরিসর বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ড্রেনেজে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ পানি যাবে, বাকিগুলো যাওয়ার কথা ভূগর্ভে বা নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধারে, কিন্তু এটা হচ্ছে না। পানি নিষ্কাশনের ব্যাপারটি পুরোটাই হয়ে গেছে ড্রেনেজ নির্ভর।

বিশেষজ্ঞদের আরও ভাষ্য, একটি নগর-মহানগর এলাকায় ২০-২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা এবং ১০-১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা উচিত, যা শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সঙ্গে সঙ্গে পানি নিষ্কাশন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করে। নগর এলাকায় ধূসর বা কংক্রিট আচ্ছাদিত ৭০/৭৫ শতাংশ হলেই সংকট সৃষ্টি হবে, সেখানে তা ৮০ শতাংশেরও বেশি এবং তাতে জলাশয় ৫ শতাংশ ও সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।এ কারণে বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে পুনর্ভরণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ধারণ ক্ষমতার তুলনায় বৃষ্টিতে জনবিড়ম্বনা প্রকট রূপ নিচ্ছে।

বিদ্যমান সংকট নিরসনের নামে বছরের পর বছর পরিকল্পনা হচ্ছে, অর্থ খরচ হচ্ছে কিন্তু সুফল মিলছে না। আমরা মনে করি, নতুন সরকারকে সমন্বিত পরিকল্পনা করে কাজ করা বাঞ্ছনীয়। অতীতের মতো অপরিকল্পিতভাবে অর্থ খরচ না করে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা জরুরি। বেদখল জলাধার উদ্ধারের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের কাছে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব হস্তান্তর হওয়ার পরও দীর্ঘমেয়াদি সুফল কেন মেলেনি তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা,জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ, পানিপ্রবাহের পথ নিষ্কণ্টক করা ও জলাধার সংরক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ ইত্যাদি বিষয়েও মনোযোগ গভীরের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের বিকল্প নেই। অতীতে এই সংকটকে পুঁজি করে দায়িত্বশীল অসাধুরা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন এই অভিযোগও খতিয়ে দেখে প্রতিবিধানের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত