মনুষ্যসৃষ্ট সংকট ও অদূরদর্শিতার খেসারত

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:১৬ এএম

১২ জুলাই বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার ফের যে উৎকট চিত্র উঠে এসেছে তা পুনর্বার পুরনো প্রশ্নগুলোকেই সামনে এনেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় পানি জমে মানুষ ও যানবাহন চলাচলে যে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে তা অতীতের দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ১২ জুলাই গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যালয় পর্যায়ের চলমান পরীক্ষা বাতিল করা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়, কর্মজীবীদেরও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কর্মস্থলে ঠিকমতো হাজির হতে পারেননি। যানবাহন আটকে পরে রাস্তায়, সড়কের ওপর পানি থই থই, এ যেন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। এটি যে অপরিকল্পিত নগরায়ণের চরম বিরূপ ফল এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বৃষ্টি হলেই রাজধানী ঢাকার এমন জনদুর্ভোগের চিত্র নতুন নয়। বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগের সাক্ষী নগরবাসী। অথচ প্রতি বছরই জলাবদ্ধতা নিরসনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয় সরকার। দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও বলা হয় নানা উদ্যোগ গ্রহণের কথা। তবে বর্ষা এলেই ফুরিয়ে যায় এসব গলাবাজি। বেরিয়ে আসে জলাবদ্ধতার নগ্ন চিত্র। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা তো আরও নাজুক। সেখানে অতিবৃষ্টি , প্লাবন আর পাহাড়ধস যে মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ফের যে মর্মস্পর্শী ও প্রশ্নবোধক অবস্থা তৈরি করল এর পরিপ্রেক্ষিতে বারবার প্রশ্ন জাগে জলাবদ্ধতার দুর্বিষহ পরিস্থিতি নিরসনের নামে আর কত নিষ্ফল অর্থ ভূগর্ভে ঢুকবে?

একসময় রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার। পরে রাজধানীর সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা গত এক যুগেরও বেশি সময়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। কারণ হিসেবে নদী, খাল-বিলের মতো প্রাকৃতিক জলাশয় দখল ও ভরাট বহুলাংশে দায়ী। এসব দখলমুক্ত করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সুগম করতে উদ্যোগ-আয়োজনের কী ফল মিলল? জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির জন্য মন্ত্রীসহ বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিরা যে আশ্বাস দেন, এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তারা নিজেরাও জানেন না, ঢাকায় কত মিলিমিটার বৃষ্টি হলে কোন অংশে কতটুকু জলাবদ্ধতা হবে। এ থেকে রক্ষার জন্য তারা সেভাবে কাজও করছেন না। বিভিন্ন সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নিয়ে যে কাজ করছে, তাতে শুধু জনগণের টাকাই নষ্ট হচ্ছে, প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১১ জুলাই  সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকায় ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত হয়েছে ৬৩ মিলিমিটার। তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে ঢাকা।

ধারাবাহিকভাবে নগরের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ধ্বংস করা হয়েছে, সবখানে কংক্রিটের ভবন গড়ে উঠেছে। এখন আসলে পরিকল্পনা করে বা প্রকল্প নিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবে না। ৩০ বছর আগে ঢাকায় দুই হাজারের বেশি পুকুর ছিল, সেগুলো এখন কীভাবে ফিরে পাওয়া যাবে? ঢাকা শহরকে যে অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে এখানে আসলে ভারী বর্ষার পানি নিষ্কাশনের সুযোগ নেই। এটি আসলে আমাদের এতদিনের অপরিণামদর্শী কর্মকা-ের ভয়াবহ ফল। মনে রাখা দরকার, এখন টাকা খরচ করে জলাবদ্ধতা সংকটের এত সহজে পুরোপুরি সমাধান মিলবে না। ড্রেনেজে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ পানি যাবে, বাকিগুলো যাওয়ার কথা ভূগর্ভে বা নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধারে, কিন্তু এটা হচ্ছে না। পানি নিষ্কাশনের ব্যাপারটি পুরোটাই হয়ে গেছে ড্রেনেজ নির্ভর। প্রকল্পগুলো আইডিয়ালি কাজ করলে সমস্যা একটু হয়তো কমবে, কিন্তু ভারী বর্ষার জলাবদ্ধতা মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতায় যাওয়া আর সম্ভব না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নগর এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্বল্প আয়ের মানুষ বাস করছে অনানুষ্ঠানিক বস্তিতে। ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে নগরায়ণ যেমন বাড়ছে, কুমিল্লা-ময়মনসিংহের মতো মাঝারি শহরেও বাড়ছে নগরায়ণের চাপ। বাংলাদেশে অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিণামদর্শী নগর উন্নয়ন ও ভৌত পরিবর্তনের ফলে মারাত্মকভাবে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। কমিউনিটি ও বসত এলাকায় নাগরিক সুবিধা ও পরিষেবা অপ্রতুল। নগর এলাকার নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনমান মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। এই প্রেক্ষাপটে এসডিজির অভীষ্ট-১১ আমাদের মতো দেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যার মূল লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাত-সহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলা। ঘন জনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বহুক্ষেত্রে ভুল উন্নয়ন পরিকল্পনা, মনুষ্যসৃষ্ট অপকাণ্ড সব মিলিয়ে নগর-মহানগরকে ভয়াবহ দুর্যোগের মুখে নিপতিত করেছে।

নগর এলাকার সবুজ এলাকা, খোলা জায়গা কিংবা পার্ক উদ্যানগুলো বৃষ্টির পানিকে মাটিতে পুনর্ভরণের মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি শহর এলাকায় ২০-২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা এবং ১০-১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা উচিত, যা শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সঙ্গে সঙ্গে পানি নিষ্কাশন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করে। নগর এলাকায় ধূসর বা কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা ৩৫-৫০ শতাংশ হলে যেখানে ভূপৃষ্ঠে পানিপ্রবাহ (সারফেস রান অফ) বৃষ্টিপাতের ৩০-৩৫ শতাংশ হয়, সেখানে কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা ৭৫ শতাংশ হলে ভূপৃষ্ঠে পানিপ্রবাহ ৬০ শতাংশের বেশি হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার মূল শহর এলাকায় কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা ৮০ শতাংশের ওপরে, যেখানে জলাশয় ৫ শতাংশ ও সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা ১০ শতাংশের মতো। ফলে ঢাকা শহরে কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা বেশি হওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে পুনর্ভরণের সুযোগ অনেক কম হওয়ায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ধারণক্ষমতার তুলনায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানির পরিমাণ বেশি হয়ে যাওয়ার ফলে ঢাকা-চট্টগ্রামে অল্প বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। দেশের অন্যান্য নগর এলাকার চিত্রও অনেকটা এ-রকমই।

যেকোনো নগরের বৃষ্টির পানির নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। বিগত দিনগুলোয় আমরা শহরের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে বয়ে চলা অগণিত খালের প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে বক্স কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে কিংবা পাম্প স্টেশনভিত্তিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা করায়, আমাদের জলাবদ্ধতা সমস্যাকে ক্রমাগতভাবে প্রকট করে তুলেছে। পাশাপাশি নগর সংস্থাগুলো বক্স কালভার্ট কিংবা নগরের নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়নি। আমাদের জলধারণ করত যেসব পুকুর, সেগুলো নির্বিচারে ভরাট করেছি আমরা, কুমিল্লা শহরও এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে আমাদের বিদ্যমান খাল ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা কমেছে এবং অল্প বৃষ্টিতেই আমরা নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হতে দেখেছি নিয়মিত।

হাইকোর্ট দেশের সব নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোর নদীর নেটওয়ার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের বিদ্যমান পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং জলাশয়  সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী খাল বা জলাশয় দখল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একই সঙ্গে মহানগর, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকায় অবস্থিত ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে রেকর্ড করা পুকুরগুলোকে প্রাকৃতিক জলাধারের সংজ্ঞাভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জলাশয় দখলের জন্য কারাদণ্ডের বিধানসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রবিধান আছে। ভারতেও জলাশয় দখলকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে যথাযথ শাস্তির বিধান রেখে সম্প্রতি আইন প্রণীত হয়েছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের কঠোর শাস্তি প্রয়োগ ছাড়া জলাশয় দখল-দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে না। এসব নিয়ে কথা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি কিয়দংশও; বিদ্যমান পরিস্থিতি তা-ই বলছে। 

আমরা অনেক সময়ই দেখি সরকারি-বেসরকারি অনেক পরিকল্পনা ও প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার ভরাট করে পরবর্তী সময়ে অনেক ব্যয়বহুল কৃত্রিম ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে প্রাকৃতিক খাল-জলাশয়কে জীবন্ত সত্তা বিবেচনা করলে তাকে ধ্বংস করে কৃত্রিম ব্যবস্থাপনা কখনো টেকসই হবে না, স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাংঘর্ষিক। সিটি করপোরেশন দুদিন পরপরই খাল থেকে ময়লা তুলে পাশেই ফেলে দেয়। এতে আবারও ময়লা খালে গিয়েই পড়ছে। আবার কমিউনিটিকে এনগেজড করতে পারছে না যে, খালে ময়লা ফেলবেন না। আবার অনেক খাল দখল হয়ে গিয়েছে, খালের নেটওয়ার্কের মধ্য বিল্ডিং হয়ে গিয়েছে। ছোট ড্রেন-নালা যেগুলো আছে সেগুলো ময়লা আবর্জনায় ঢাকা। এগুলো বছরের পর বছর পরিষ্কার করা হয় বলে মনে হয় না। আল্টিমেটলি আমাদের আন্ডারগ্রাউন্ড পানি যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে ঢাকার জলাবদ্ধতা করুণ একটা অবস্থায় চলে এসেছে।

লেখক : শিক্ষাবিদ। নগর পরিকল্পনা-উন্নয়ন, আবাসন ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ। প্রেসিডেন্ট, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত