একান্নবর্তী পরিবার-সংস্কৃতিতে ক্ষয়

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০৯ এএম

একান্ন বা যৌথ পরিবারের বিষয়টি বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা। কেননা সময়ের বিবর্তনে একে একে একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন বহু আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন অবশিষ্ট যদি থেকেও থাকে তবে সেটা অতিনগণ্য। পরিবার মাত্রই স্বামী, স্ত্রী এবং তাদের সন্তানরা। এর বাইরে পরিবারভুক্ত হিসেবে কাউকে গণ্যও করা হয় না। যদি বৃদ্ধ বাবা-মা বেঁচে থাকেন তবে তাদের নিয়েও ভাইয়ে-ভাইয়ে নানা টানাপড়েন দেখা দেয়। বাবা-মায়ের দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনীহা দেখায় সন্তানরা। গলায় ফাঁসের মতোই কোনো কোনো পরিবারে বাবা-মায়েরা ত্রিশঙ্কুর মতো ঝুলে থাকেন, অনাদরে-অবহেলায়। একমাত্র নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্ন শ্রেণির পরিবারে শত কষ্টে হলেও বাবা-মায়েদের ত্যাগ না করে সন্তানরা সঙ্গে রাখে। শহরের উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে এটি কমে কমে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। গ্রাম-মফস্বলে যে রয়েছে তাও নয়।

একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য তো বটেই, পাশাপাশি সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে যে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ক্রমাগত তীব্র আকার ধারণ করে চলেছে তার প্রভাবই মূলত দায়ী। মানুষের সমষ্টিগত ভাবনার জগৎ বলে বাস্তবে এখন আর কিছু নেই। সবাই যার যার, তার তার। অর্থাৎ ব্যক্তি তার একান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বাইরে কিছুই ভাবছে না। এ জন্য ব্যক্তিকে অবশ্য এককভাবে দায়ী করা যাবে না। সমস্যার মূলেই ব্যবস্থা। আমরা কোন ব্যবস্থার অধীনে, সেটা অনুধাবন করতে না পারলে সমাধানের পথ কিন্তু খুঁজে পাব না। একান্নবর্তী পরিবার মানেই যে আদর্শ পরিবার, সেটা কিন্তু নয়। একান্নবর্তী পরিবারে নিপীড়ন, যন্ত্রণা, হতাশা, বৈষম্য ইত্যাদি খুবই পরিচিত বিষয়। একই পরিবারের সব সদস্যের আয়-উপার্জন সমান হয় না। কারও বেশি, কারও কম। এই আয়ের কম-বেশিতে শ্রেণি অসমতাই বৈষম্যের জন্ম দেয়। পরিবারের কর্র্তৃত্ব সে-ই লাভ করে যে সর্বোচ্চ আয় করে। তারই বশবর্তী হতে হয় অন্যদের। সবচেয়ে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হয় তাদেরই, যাদের স্বামীর আয়-উপার্জন স্বল্প সে সব নারীকে।

নানা ক্ষেত্রেই পরিবারের ধনী-নির্ধনের বৈষম্য প্রকাশ পায়। যে ভাইটি বা ভাইদের অধিক উপার্জন তারা একান্নবর্তী থাকাবস্থায়ও আলাদা উন্নতমানের পৃথক রান্নার আয়োজন করেন। পরিবারের অন্যদের পাশ কাটিয়ে ঘরে নিয়ে সে খাবার তারা চরম নির্লিপ্ততায় খেয়ে থাকেন। এতে পরিবারভুক্ত অন্যদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কোনো উপায়ও থাকে না। তারা হতাশ হন, দুঃখিত হন, নিরুপায়ে মেনে নিতে বাধ্য হন, একান্নবর্তী পরিবারের অভ্যন্তরের এই নজরকাড়া বৈষম্য। একান্নবর্তী পরিবারের সংস্কৃতি সুদীর্ঘকাল আমাদের বঙ্গদেশে বলবৎ ছিল। পরিবারবিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। তাই বৈষম্যপূর্ণ একান্নবর্তী পরিবার দীর্ঘ মেয়াদে টিকেছিল। খাওয়া-খাদ্যের ভিন্নতার পাশাপাশি আয়াসে-বিলাসে, পোশাক-পরিচ্ছদে, সন্তানদের শিক্ষাঙ্গনের ভিন্নতাও অতিসাধারণ বিষয়। এখনো যদি কোনো একান্নবর্তী পরিবার থেকে থাকে তবে সেখানেও একই চিত্র দেখা যাবে। শ্রেণিবৈষম্য আমাদের সমাজে যেমন বিদ্যমান, একইভাবে যৌথ পরিবারেও সেটা বিলক্ষণ দেখা যায়।

আমার দেখা একটি যৌথ পরিবারের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করছি। আমি তখন কিশোর বয়সি। আমাদের পাশর্^বর্তী একটি পরিবারে অনেকগুলো ভাই-বোন। সাত ভাই, চার বোন এবং তাদের বাবা-মা। ছোট তিনভাই স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। অপর তিন বোন স্কুল-কলেজগামী। যে চার ভাই চাকরি করতেন, তাদের দেখতাম সামর্থ্যানুযায়ী প্রতিদিন হাতে করে পরিবারের সমস্ত সদস্যের জন্য ফলমূল, নানা পদের খাবার নিয়ে বাসায় ফিরতেন। পরিমাণেও ছিল যথেষ্ট। অথচ ওই পরিবারের ছেলেরা একে একে বিয়ে করার পর যৌথ ওই সংসারে বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটে। চাকরিজীবী চার ভাই কর্মস্থল থেকে ফেরার সময় প্রতিদিন হাতে করে খাবারের প্যাকেট আনতেন বটে, তবে পরিমাণে এতই নগণ্য যে সে খাবার দু’তিনজনের অতিরিক্ত নয়। অর্থাৎ বিয়ের পর ভাইয়েরা সামষ্টিক ভাবনা থেকে একে একে সরে এসে আত্মকেন্দ্রিকতার বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। যৌথ পরিবারে থাকলেও একান্নবর্তী রান্না তাদের কাছে যথেষ্ট মনে হতো না। তাই উপার্জনকারী ওই চারভাই এবং তাদের স্ত্রীরা দামি মাছ, গরু, খাসি, মুরগির মাংস আলাদাভাবে এনে রান্না করে নিজেদের ঘরে তুলে রাখতেন এবং স্বামী-স্ত্রী এবং নিজ সন্তানদের নিয়ে সেই পৃথক রান্না খেতেন। একপক্ষ সুবিধাভোগী, অপরপক্ষ সুবিধাবঞ্চিত। ক্রমেই অর্থনৈতিক কারণে তাদের ভেতরে ভাঙনের সৃষ্টি হয়।

যৌথ পরিবার কখনোই বৈষম্যহীন ছিল না। পরিবারের ভেতরে মন কষাকষি, মনোমালিন্য, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, বৈরিতা, বৈষম্য, দুঃখ-হতাশা, অমানবিকতা বিরাজ করত। শ্রেণি বৈষম্যপূর্ণ সমাজের প্রভাবমুক্ত ছিল না যৌথ পরিবারগুলোও। পরিবারের সদস্যরা যতই নিকটবর্তী হোক না কেন, শ্রেণিগত অবস্থান তাদের দূরবর্তী করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। সৃষ্টি করে পরস্পরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার। বিশেষ করে উচ্চ এবং মধ্যবিত্তদের সচেতনতার কারণে পরিবারে সন্তানদের সংখ্যা বড় জোর দুজনের বেশি নয়। তাই একক পরিবারে বৈষম্য দেখা যায় না। তারা কেবল তাদের নিয়েই ভাবে, শ্রেণিগতভাবে নিচু অবস্থানের নিকটজন বা নিকটাত্মীয় পরিজনদের বিষয়ে মোটেও ভাবে না। তাদের হৃদয়জুড়ে কেবলই নিজেদের নিয়েই ভাবনা। অর্থাৎ আত্মকেন্দ্রিকতায় বৃত্তবন্দি থাকা। সমষ্টিগত ভাবনা পরিবার থেকে যেমন বিদায় নিয়েছে, তেমনি সমাজ থেকেও। সমাজতন্ত্রী দাবিদার ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রায়শ বলে থাকেন, ‘একান্নবর্তী পরিবার সমাজতন্ত্রেরই অভিন্ন রূপ। একান্নবর্তী পরিবার মাত্রই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবিকল।’ কোন বিবেচনায় তিনি ওই দৃষ্টান্ত তুলে ধরছেন, জানি না। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় এতে প্রকাশ পায় তিনি কোন এবং কীরূপ সমাজতন্ত্রে আস্থা রাখেন!

লেখক : নির্বাহী  সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত