অবহেলিত শেরেবাংলার জন্মস্থান

আজ ২৬ অক্টোবর। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বাংলার বাঘ খ্যাত শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৭৩ সালের এই দিনে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ বর্তমানে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের মিয়া বাড়ির মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ওয়াজেদ আলী একজন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং মা বেগম সৈয়দুন্নেছা ছিলেন একজন গৃহিণী। শেরেবাংলার জন্মস্থানে তার অনেক জন্মস্মৃতি থাকলেও এখন তা বিলুপ্ত প্রায়। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে জন্ম ভবনটি। জন্মের দেড়শ বছরে আঁতুরঘরের দায়সারা সংস্কার ও একটি ফলক ছাড়া তার জন্মস্মৃতি রক্ষার্থে নেওয়া হয়নি কোনো কার্যকরী উদ্যোগ।

জেলার রাজাপুরের সাতুরিয়া এলাকার বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে সাতুরিয়ার মিয়া বংশের জমিদার বাড়ি অবস্থিত। এই বাড়ির মালিক ছিলেন দক্ষিণ অঞ্চলের তৎকালীন জমিদার আহম্মদ বকস মিয়া। তিনি শেরেবাংলার নানা। এ বাড়িতেই জন্মেছিলেন তিনি। শৈশবের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন তার এই নানার বাড়িতেই। এখানে ঘাট বাঁধানো পুকুরে গোসল করা, পাশের নদীতে সাঁতার কাটা, গাছ থেকে বাদাম পেরে খাওয়াসহ অনেক স্মৃতি পড়ে আছে এই বাড়িতে। তবে তার জন্মস্থান সাতুরিয়ায় মিয়া বাড়ির সেই আঁতুরঘর ও দালান এখন সংস্কারবিহীন জড়াজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এক যুগ আগে তার ব্যবহৃত অনেক আসবাবপত্র এই বাড়িতে পড়ে থাকতে দেখা গেলেও বর্তমানে মূল্যবান ওইসব জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। তার ব্যবহৃত অবশিষ্ট একটি চেয়ার এই বাড়ির বারান্দায় কিছুদিন আগেও পড়ে থাকতে দেখেছেন স্থানীয়রা, এখন তা নেই। তার প্রতিষ্ঠিত সাতুরিয়া এম এম মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিরও বেহাল দশা। ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা, আসবাবপত্র সংকটসহ শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

জানা গেছে, প্রায় ১০ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর শেরেবাংলা যে কক্ষটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেটির প্লাস্টার ও ছাদের নিচের কয়েকটি কাঠের খুটির সংস্কারসহ শ্বেতপাথরের একটি ফলক স্থাপন করে।

শেরেবাংলার বাল্যকালের শিক্ষাজীবন কেটেছে রাজাপুরের সাতুরিয়ায়। শিক্ষাজীবন শেষে রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখেন এবং রাজনীতিতে তিনি সফলতা লাভ করেন। তিনি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে অগণিত খেটে খাওয়া মানুষের জমিদারদের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেন। যার ফলে বাঙালি জাতি আজ শিক্ষার আলো দেখতে পেয়েছে।

শেরেবাংলার জন্মস্থান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিনিয়ত অনেক পর্যটক আসেন। তবে তারা হতাশ হয়ে ফিরে যান তার জন্মস্মৃতি আর জরাজীর্ণ ধ্বংসস্তূপ দেখে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন তার জীবন ইতিহাস সম্পর্কে দেখতে, শুনতে আর জানতে। কিন্তু পুরনো আঁতুরঘর ও কাচারি ঘরের ধ্বংসস্তূপ ছাড়া এখানে দেখার মতো কিছু নেই।

শেরেবাংলার জন্মভিটা দেখতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন, ‘জেলার বাইরে থেকেও অনেক দর্শনার্থী এই মহান নেতার জন্মভিটা দেখার জন্য ছুটে আসেন। কিন্তু এখানে দুটি জরাজীর্ণ ভবন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি ফলক ছাড়া আর কিছুই দেখার নেই।’

সাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাইনুল হায়দার নিপু বলেন, ‘আমি এ পরিষদের দায়িত্ব নিয়েছি প্রায় দুই বছর। কিন্তু এ সময়ে সরকারিভাবে মহান এ নেতার জন্মভিটায় তার জন্ম বা মৃত্যু দিনে কোনো আয়োজন করতে দেখিনি। তা ছাড়া তার জন্মভিটা রক্ষার্থে এখানে সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করাও হয়নি। ১০ বছর আগে প্রতত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আঁতুরঘর নামমাত্র সংস্কার ও একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছিল যা এখন প্রায় ধ্বংসের পথে। এ ছাড়াও তার প্রতিষ্ঠিত এম এম মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিরও এখন বেহাল দশা। শেরেবাংলার নানার উত্তরাধিকারীদের করা মামলার কারণে বিদ্যালয় নতুন ভবন পাচ্ছে না। ফলে জরাজীর্ণ অবস্থার মধ্যেই শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে। তার স্মৃতিবিজরিত জন্মভিটা রক্ষার্থে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। না হলে যেটুকু বিদ্যমান আছে অচিরেই তাও বিলীন হয়ে যাবে।’

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, ‘শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্মভিটা রক্ষার্থে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল শুনেছি। কিন্তু কী কারণে বন্ধ রয়েছে তা জানি না। আমি শিগগিরই তাদের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার ব্যবস্থা নেব।’