‘অদ্ভুত’ ঘূর্ণিঝড় হামুনের তান্ডবে অচল কক্সবাজার

ঘূর্ণিঝড় হামুনের আঘাত যে এত ভয়াবহ হবে, সেটা আবহাওয়া দপ্তরের সংকেতে আঁচ করা গিয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার দুপুরের পর তাদের বুলেটিনগুলোতে দেওয়া পূর্বাভাসে হামুনের ‘অদ্ভুত’ আচরণ লক্ষ্য করা যায়। দ্রুত ঘূর্ণিঝড় ও অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়া হামুনের গতিবেগ শেষের দিকে মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছিল। উপকূল অতিক্রমের সময়ও পরিবর্তন হয়েছে। যে কারণে কক্সবাজারের মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ষতির শিকার হয়েছে।

কক্সবাজারে ঘূর্ণিঝড় হামুনের আঘাতে প্রায় ৫০ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক তছনছ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। মারা গেছে তিনজন।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী পৌরসভা ও ১৪ ইউনিয়নে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে গাছ পড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একই কারণে সড়ক যোগাযোগও অচল হয়ে গিয়েছিল, যা গতকাল দুপুর নাগাদ স্বাভাবিক করা হয়েছে। এ ছাড়া গাছচাপা পড়ে মারা গেছে দুজন।

আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি জেলা প্রশাসনের তথ্যের বরাত দিয়ে জানান, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার পরপরই গড়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড় হামুন। যাওয়ার আগে কক্সবাজার ও মহেশখালী পৌরসভাসহ জেলার ৭১টি ইউনিয়নেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন রেখে যায়। ঘূর্ণিঝড়ে জেলার ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫৪৯ বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামুন তার সর্বোচ্চ ১৪৮ গতিতে বিধ্বস্ত করেছে ৪২ হাজার ৯৫৯টি ঘরবাড়ি। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ৫ হাজার ১০৫টি এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের সংখ্যা ৩২ হাজার ৭৪৯। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুতের ৩৫৪টি খুঁটি ভেঙে গেছে, বিকল হয়েছে ২৩টি ট্রান্সফরমার। ৪৯৬টি স্থানে তার ছিঁড়ে গেছে, ৮০০টি স্থানে গাছ পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। কক্সবাজার পৌরসভা, সদর উপজেলা, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও চকরিয়ায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে। পাশাপাশি এসব এলাকায় মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামুন তান্ডবে শহরের হলিডে মোড়, সদর হাসপাতাল সড়কেই উপড়ে পড়েছে ২৫টির বেশি গাছ। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে বৈদ্যুতিক তার। ফলে এসব সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এলাকাগুলো এখনো বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কহীন।

হামুনে লন্ডভন্ড হয়েছে পৌরসভার ১, ২, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড। তবে ১ নম্বর ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার প্যানেল মেয়র শাহেনা আক্তার পাখি দেশ রূপান্তরকে বলেন, হামুনে ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায়ই ৯৫ ভাগ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।

ওই ওয়ার্ডে গিয়ে কথা হয় দক্ষিণ কুতুবদিয়াপাড়া গ্রামের লুৎফুন নাহারের সঙ্গে। নিজের ভেঙে যাওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পাঁচ মেয়ে নিয়ে এই ঘরে থাকতাম। এখন আমি কী করব?’ এ কথা বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

ওই এলাকার বাসিন্দা জেলে ফরিদুল আলম বলেন, ‘আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে আমাদের কোনোভাবেই সতর্ক করা হয়নি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়।’

শহরের চেয়ে গ্রামের অবস্থা আরও করুণ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহেশখালী। মহেশখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরীফ বাদশা বলেন, দ্বীপের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাস্তাঘাটে বুধবার রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত অনেক গাছ পড়ে রয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড়ে মহেশখালীতে নিহত হয়েছেন একজন। এ ছাড়া ১০ হাজার ঘরবাড়ি ও ৫ হাজার পানের বরজ বিধ্বস্ত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস যান চলাচল স্বাভাবিক করতে কাজ করছে।

কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। আপাতত ১৫০ পরিবারকে ঢেউটিন দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বিদ্যুৎ ও মোবইল নেটওয়ার্ক না থাকায় কক্সবাজারের স্থানীয় একটি পত্রিকাও বুধবার প্রকাশিত হয়নি।

কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় বুধবার কক্সবাজারের স্থানীয় ২৪টি দৈনিক প্রকাশিত হয়নি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, ঘূর্ণিঝড় হামুনের আঘাতে এ পর্যন্ত তিনজন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছে বলে খবর পেয়েছি। হামুনের আঘাতে সড়ক-উপসড়কে গাছপালা উপড়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক না থাকায় কক্সবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। পুরো জেলায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সচল করতে কয়েক দিন সময় লাগবে।

পেকুয়া-কুতুবদিয়া প্রতিনিধি জানান, পেকুয়ার সাত ইউনিয়নের প্রায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও দুই হাজার ঘরবাড়ি। উপড়ে গেছে শত শত গাছপালা। ফসলি জমি ও বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে সাত ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। চকরিয়া উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বাসিন্দা ও বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতির প্রবীণ সদস্য আসকর আলী উপড়ে যাওয়া গাছের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন।

চকরিয়া উপজেলার মানিকপুর সড়কের একটি সেতু বিধ্বস্ত হয়ে উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

পেকুয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সড়কে গাছ উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ করা হয়েছে। পেকুয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আবু তাহের জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার লোকজনের জন্য সরকারের দুর্যোগ অধিদপ্তর থেকে দুই টন চাল ও ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, বাঁশখালীতে বিদ্যুতের শতাধিক খুঁটি উপড়ে ও ভেঙে গেছে। এ কারণে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বাঁশখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) রিশু কুমার ঘোষ।

তিনি বলেন, বাঁশখালীর প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রে বিশাল গাছ পড়ে পাঁচটি খুঁটি ভেঙে গেছে। ৩৩ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনের একটি টাওয়ার ভেঙে গেছে। ১৩০টি খুঁটি ভেঙে যাওয়ার তথ্য তারা পেয়েছেন বলে ডিজিএম জানান।

বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস ইউনিটের টিম লিডার আজাদুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড়ে যেভাবে গাছপালা ভেঙে পড়েছে, তা কল্পনাতীত। গতকাল দুপুর পর্যন্ত গাছ সরিয়ে প্রধান সড়কে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড়ে সরল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর সরল গ্রামের কবির আহমদের স্ত্রী মমতাজ বেগম (৭০) এবং কাথরিয়া ইউনিয়নের কোর্টপাড়ার ফজল আহমদের ছেলে মমতাজ উদ্দিন (৬০) মারা গেছেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার পর ঘূর্ণিঝড় হামুন কুতুবদিয়া হয়ে উপকূল অতিক্রম শুরু করে। এর আগে দুপুর ১টায় ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতির ‘হামুন’ বিকেল সাড়ে ৪টায় ১১০ কিলোমিটারে নেমে আসে। ওই সময় দেওয়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১২ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়টি সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার থেকে সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিতে অতিক্রম করবে। এ সময় উপকূলীয় এলাকায় সাধারণ জোয়ারের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতার বেশি জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এজন্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৫ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। তবে সন্ধ্যা ৭টার ১৩ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়টি পরবর্তী ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার মধ্যে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করবে। এ সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ দুপুর ১টায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১১ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছিল, ঘূর্ণিঝড়টি অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ থেকে সর্বোচ্চ ১৩০ কিলোমিটার গতিতে এগোচ্ছে। আর এটি বুধবার সকালে মেঘনা মোহনার ভোলার কাছ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু সাড়ে তিন ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টায় ১২ নম্বর বুলেটিনে তা প্রায় ১২ ঘণ্টা এগিয়ে গেল এবং গতিপথও প্রায় ১০০ কিলোমিটার নিচে (দক্ষিণে) চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে অতিক্রম করবে বলা হয়।