মলয়, মলয় রায়চৌধুরীর প্রলয়ঙ্করী শব্দশৈলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে হঠাৎ করেই। কোনো এক লিটল ম্যাগের দীর্ঘ কবিতা সংখ্যায় তার ‘জখম’ কবিতাটার মাধ্যমে। এরপর বহুদিন পর্যন্ত মলয়ের সেই জখম আমাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছিল...।
মলয় রায়চৌধুরী, বাংলা সাহিত্যে যার প্রবেশ ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর মতো। মাত্র ২৪ বছর বয়সে লেখা একটি ৯০ লাইনের কবিতা দিয়েই তিনি বাংলা সাহিত্যে নতুন ও বাঁকবদলের কিংবা সো কল্ড পলিটিক্যালি কারেক্টনেস থেকে বলা চলে ভিন্নতার ইতিহাস রচনা করেছেন। আর তিনটা দিন পরেই আরেকটা জন্মদিন আসত, তার আগেই চলে গেলেন মলয়! শতভাগ বিদ্যুতায়িত হওয়ার প্রচারের মধ্যে বসে মলয়ের প্রয়াণে মনে হলো- বিদ্যুৎ চলে গেল! প্রায় ভুলে থাকার মধ্যে তার এই শারীরিক মৃত্যু যেন হঠাৎ লোডশেডিং... চমকালো।
‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ এর চাইতে অবশ্য আমার জখম বেশি প্রিয়। হতে পারে সেটি প্রথম হাতে আসে বলে। তাছাড়া নন্দনগত দিক থেকে দুটি কবিতাই একই স্বরের প্রতিনিধিত্ব করে। এটিতে জখমজাত যন্ত্রণার টানা চিৎকার, গোঙানি; অন্যটিতে অবদমিত বাসনার চিৎকার, শীৎকার। এই লেখায় ঘুরেফিরে ওই দুই কবিতার বিভিন্ন লাইন ঢুকে পড়বে... অবধারিতভাবে।
ষাটের দশকের হাংরি মুভমেন্টের কিংবদন্তি মলয় রায়চৌধুরী বৃহস্পতিবার ৮৪ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন। একে নিশ্চয়ই অকাল প্রয়াণ বলা যাবে না। খেয়াল করুন এই লেখায় এখন পর্যন্ত তাকে কবি মলয় রায়চৌধুরী বলিনি। প্রচ- কবি হলেও, বাংলা সাহিত্যে তিনি ডাইনোসরের মতো বিশাল দানবীয়। যেমন, ফেসবুক প্রোফাইলে এই বয়সেও যথেষ্ট সক্রিয় থাকা মলয় নিজের বায়োতে লিখে রেখেছেন- উপন্যাস, কবিতা, গল্প, নাটক, জীবনী, অনুবাদ, হাংরি আন্দোলন। অর্থাৎ মুখ্যত কবি হলেও সব শাখাতেই তিনি বিচরণ করেছেন।
বাংলা সাহিত্যে স্থিতাবস্থা ভাঙার আওয়াজ তুলে, ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে, শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি আন্দোলন। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায়। সমীর, শক্তি আগেই শূন্যতা তৈরি করেছেন। কদিন আগে চলে গেলেন দেবী রায়। এবার মলয়...। ‘হাংরি প্রজন্মকে’ বিদায় জানাচ্ছি আমরা। আর পৃথিবী তোলপাড় করা ষাটের দশক থেকে শত যুদ্ধ, শান্তিচুক্তি, প্রেম-অপ্রেম, প্রতারণা, সৌন্দর্যের-কদর্যের কারবার দেখে একই চক্রব্যূহের ভেতর থেকে মলয় যেন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হিসেবে বলছেন- ‘কিছুই হল না আমার পৃথিবীরো কিছু হবে না শেষ ওব্দি’।
ইশতেহার প্রকাশের পর হাংরি আন্দোলন ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী সেই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মূলত মলয় রায়চৌধুরীর হাত ধরেই। জিওফ্রে চসারের একটি লেখা থেকে হাংরি শব্দটিকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। মলয়ের দাদা সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি, দেবী রায় ছাড়া পরে এই আন্দোলনে যুক্ত হন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চক্রবর্তী। বিরোধিতার জায়গা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নামও যুক্ত হয়েছিল ওই আন্দোলনের সঙ্গে। সেই প্রজন্ম পরিচিত হতে থাকে ‘হাংরি প্রজন্ম’ নামে। নোবেলজয়ী মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ কলকাতা ঘুরতে এসে হাংরি কবিদের সান্নিধ্যে নিবিড় সময় কাটান।
১৯৬৪ সালে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির জন্য রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মলয়। তাকে কারাবরণও করতে হয়েছিল, হারাতে হয়েছিল চাকরি। নন্দনতাত্ত্বিক অভিযোগে গ্রেপ্তার-কারাবরণের ঘটনা বাংলা সাহিত্যে আর আছে কি না, আমার জানা নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই মামলায় মলয়ের হাংরি সহযোগীদের অনেকে তার বিরুদ্ধে গেলেও, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আদালতে তার পক্ষে দাঁড়ান। উল্লেখ্য, ‘সুনীলের সাহিত্য বিরোধিতা’ হাংরি কবি-সাহিত্যিকদের একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল। এতসব ঘটনার পরও মলয় লেখালেখি চালিয়ে গেছেন, গোঁয়ারের মতো... সিংহের মতো। লিখেছেন দুই শতাধিক গ্রন্থ। ‘শয়তানের মুখ’, ‘জখম’, ‘ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস’, ‘নামগন্ধ চিৎকার সমগ্র’, ‘কৌণপের লুচিমাংস’, ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যতœ করে রেখো’ তার উল্লেখযোগ্য রচনা। ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানবিরোধী মলয়কে এরপর থেকে হয়তো প্রতিষ্ঠানও আর ঘাঁটাতে যায়নি কখনো। ১৯৩৯ সালের ২৯ অক্টোবরে সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতা খ্যাত সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারে মলয় রায়চৌধুরীর জন্ম। তার বাবা গৌচপ্রম রায়চৌধুরী ছিলেন চিত্রশিল্পী-ফটোগ্রাফার। মা অমিতা ছিলেন পাণিহাটির নীলামবাটির কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (রোনাল্ড রস-এর সহায়ক) জ্যেষ্ঠ কন্যা।
অনেকে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গেও মলয় এবং হাংরিদের যোগসূত্র খুঁজতে চান। তবে আমার মনে হয়েছে নকশালের চেয়ে হিপ্পিদের সঙ্গেই বেশি সাহিত্যিক লেনদেন হয়েছে তাদের। মনে রাখতে হবে, ওই সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা এড়াতে অনেক আমেরিকান হিপ্পি হিসেবে ভারতে আসছিলেন। অনেকে আধ্যাত্মিক অন্বেষণেও ভারতগামী হতেন। তাদেরই একজন ছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। থাকা-খাওয়া, গাইডের পাশাপাশি শোনা যায় ড্রাগসের বিনিময়ে হাংরিরা তাদের কাছ থেকে বিদেশি বই-পুস্তক নিতেন। সত্য-মিথ্যা যাই হোক গিন্সবার্গ তাদের ‘বিট মুভমেন্টের’ সঙ্গে হাংরিদের মিল খুঁজে পান। তার মাধ্যমে হাংরিদের লেখাপত্তর বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। মলয়ের মামলা চলাকালেও গিন্সবার্গ তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
সাহিত্য করতে এসে একসময় অনুপ্রেরণা হিসেবে আবিষ্কার করেছিলাম মলয় রায়চৌধুরীকে। পরে সাহিত্যের সেই নন্দন ছেড়ে এলেও মলয় তো ছিলেনই..., যেমন করে স্বজনরা থাকেন। তার মৃত্যুর খবরটি তাই স্বজন হারানোর খবরের মতো দুঃখবোধ আক্রান্ত। ‘দুঃখ কষ্টের শুনানি মুলতুবি রেখে’ এটা নিশ্চিত বলা যায় যে- একঘেয়ে আর কলাকৈবল্যের শিল্প-সহিত্য চর্চার লীন বাংলা সাহিত্যে মলয় তার ভিন্নতা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছেছেন... যেখানে যেতে প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা সাহিত্যের আরও সময় লাগবে। মলয় যেমন বলেছেন- ‘আমি তো পাহাড় থেকে ঝাঁপ-দেয়া ঝর্ণার ফুর্তি’; মরমী আর শ্লোগানভর্তি, ছিঁচকাঁদুনে আর মাতমকারী বাংলা কবিতায় ফুর্তি নামুক মলয় হারানোর মলয়বাতাসে। বিরূপ বিশে^ যে মলয়ের ‘শস্যের শাঁসের হেঁসেলে ঢুকে-থাকা পোকার অলস আরামের খোঁজে ছুটোছুটি করা হল না’, মৃত্যুতে তার আত্মা এই জেনে শান্তি পাক যে- পৃথিবীতে এখনো ‘রোগীর গলা ফুঁড়ে গ্লুকোজ যাচ্ছে আবার তাকে হিঁচড়ে রাস্তায় নাবিয়ে জীবনের ধকল সওয়ানো হবে বলে’। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনস্বীকার্য নাম হিসেবেই উচ্চারিত হবেন মলয় রায়চৌধুরী। তবু, ‘ওঃ মলয়’, আপনার মৃত্যুর খবরে এপার বাংলায় বসে- ‘কল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ...’। মনে হচ্ছে- বাংলা সাহিত্যের একটা কালপর্বের শেষ হলো- এন্ড অব এরা।