১৭৫ টাকার অভাবে হাসপাতালে অভুক্ত থাকলেন চুরাশি বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা তোতাব আলী ওরফে তোতা মিয়া। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে ১৮ অক্টোবর তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হন তিনি। ছয় দিন ধরে তাকে একটি কেবিনে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। বিনামূল্যে কেবিন থেকে ওষুধের পাশাপাশি তিনবেলা খাবার পেতেন তিনি। কিন্তু গত মঙ্গলবার থেকে তাকে আর খাবার দেওয়া হয়নি। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসারের বরাত দিয়ে তাকে জানানো হয়েছে, এখন থেকে বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হবে না। খাবার পেতে হলে প্রতিদিন ১৭৫ টাকা করে পরিশোধ করতে হবে।
মুক্তিযোদ্ধা তোতাব আলীর বাড়ি তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরের শতদল গুচ্ছগ্রামে (আদর্শগ্রাম)। দুই ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে ছোট ছেলের পরিবারে থাকেন তিনি। বড় ছেলে মজিবর রহমানের একই বাড়িতে আলাদা সংসার। মূলত মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা দিয়ে ঋণের কিস্তি, ওষুধ আর খাবার চলে তার।
তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তোতাব আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জীবন বাজি রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তিনি। ভারতে এক মাসের ট্রেনিং নিয়ে মুজিব বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে সবাই খাবার পেলেও কেবিনে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাকে খাবার দেওয়া হয়নি। তবে গত ছয় দিন সব ঠিকঠাক ছিল। মঙ্গলবার হাসপাতালের এক নার্স (নাম জানেন না) তাকে জানান, হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) বলেছেন, হাসপাতালে খেতে হলে তাকে প্রতিদিন ১৭৫ টাকা করে দিতে হবে। টাকা না থাকায় দুদিন ভাত খাননি তিনি। দোকান থেকে বাকিতে পাউরুটি ও বিস্কুট কিনে খেয়েছেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা তোতাব আলী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা ভাতার ২০ হাজার টাকার মধ্যে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি দিই। ওষুধের দোকানে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। বাকি পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে খাবারসহ বিভিন্ন খরচ করি। আজকে সারা দিন আমার ভাগ্যে ভাত জোটেনি। এখন বাকিতে রুটি আর সবজি কিনে আনলাম। রাতে খাব। ভাতা পেলে দোকানের টাকা পরিশোধ করে দেব।’
তোতাব আলীর বড় ছেলে মজিবর রহমান বলেন, ‘হাসপাতালে বাবাকে সারা দিন খাবার দেয়নি, এটা আমি রাতে জানতে পেরেছি। এরপর বাইরে থেকে খাবার কেনার টাকা দিয়েছি। বাবা বলেছেন, বিষয়টি তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়েছেন। তারাই নাকি বিষয়টি দেখবেন।’
তেঁতুলিয়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তোতা মিয়া একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন, কিন্তু হাসপাতালের খাবার পাবেন না, এটা কেমন কথা। আমি তো এর কিছুই জানি না। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কোথায় এমন আইন পেলেন জানি না। আমি কথা বলি এবং বিষয়টি দেখতেছি।’
তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ নার্স ফারহানা শারমিন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ কেবিনে আগে থাকা-খাওয়া ফ্রি ছিল। সোমবার আমাদের নোট দেওয়া হয়েছে যে, সাধারণ কেবিনের রোগীদের জন্য থাকা (কেবিন ভাড়া) বাবদ ২২৫ টাকা এবং খাওয়া বাবদ ১৭৫ টাকা দিতে হবে। আর মুক্তিযোদ্ধা বা বিশেষ কারও জন্য বরাদ্দ কেবিনের রোগীদের জন্য শুধু থাকা ফ্রি। খাওয়া বাবদ তাদের প্রতিদিন ১৭৫ টাকা করে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধাকে আমি কিছু বলিনি। কোন নার্স কী বলেছেন বলেছেন, তাও জানি না।’
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রাজিনুল হক বলেন, ‘কেবিনে থাকা সব রোগীর খাওয়া বাবদ ১৭৫ দিতে হবে এটা আমি জানি। ৫০ শয্যার হাসপাতালে সবার সঙ্গে তিনিও খাবার পেতেন। কিন্তু আমি কোনো নার্সকে বীর মুক্তিযোদ্ধা তোতাব আলীর কাছে খাবার বাবদ টাকা চাইতে বলিনি। কে আমার কথা বলেছেন, তা জানা দরকার।’
তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘আগে বিশেষ কেবিনের সব ফ্রি ছিল। কিন্তু নতুন জারি করা এক পরিপত্রে বলা হয়েছে শুধু মুক্তিযোদ্ধা না, সরকারি যারা আছেন, আমরাও যারা আগে ফ্রি কেবিনে থাকতাম, সবার ক্ষেত্রে শুধু থাকাটা ফ্রি হবে। খাওয়ার জন্য ১৭৫ টাকা সবাইকে পে করতে হবে। বিষয়টি উপজেলা মিটিংয়ে অবহিত করা হয়েছে। এটা নতুন নিয়ম, এজন্য অনেকেই জানেন না। এটা সবার জন্য প্রযোজ্য। এ ছাড়া তিনি যে খাবার পাননি, এটা আমি জানি না। জানলে অবশ্যই একটা ব্যবস্থা নিতাম।’