রাজনৈতিক দলের সমাবেশ বা মহাসমাবেশ হলে কর্মীরা উদ্দীপ্ত হয় আর রাজনীতিসচেতন মানুষ আগ্রহী হয়। জানতে চায়নেতারা কী বলবেন, কী নির্দেশনা দেবেন, দেশের জন্য তাদের বস্তুনিষ্ঠ ভাবনার কথা বলবেন। অথচ বর্তমানে কর্মীরা উত্তেজিত আর জনগণ আতঙ্কিত। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ছিল এমনই এক উত্তেজনার দিন। সেদিন ক্ষমতায় ছিল আজকের আন্দোলনকারীরা আর আন্দোলনে ছিল আজকের ক্ষমতাসীন দল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেন সবাই। কিন্তু ইতিহাস কখনো আগের মতো করেই ফিরে আসে না। সেসময় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান, এখন সেটা নেই। ফলে নতুন কিছু কি হবে এবার?
ঢাকাসহ সারা দেশে উৎকণ্ঠা। মানুষ জানতে চাইছে কী হচ্ছে দেশে? ঢাকা আজ সমাবেশে লোকারণ্য আর সংঘাতের আশঙ্কায় পূর্ণ এক নগরী। কী অদ্ভুত ব্যাপার! দাবি করা হচ্ছে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কিন্তু নির্বাচন নিয়েই অশান্তির আশঙ্কা দেশজুড়ে। সংঘাত-সংঘর্ষ এড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল নির্বাচন পদ্ধতি। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে শুধু দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নয়, জড়িয়ে গেছে নানা সুবিধা। ক্ষমতা মানে এখন সবকিছু পাওয়ার ক্ষমতা, অন্যের অসুবিধা করার ক্ষমতা, ইচ্ছামতো চলার ক্ষমতা এবং আইন তৈরি ও আইন ভাঙার ক্ষমতা। তাই নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ক্ষমতার পালাবদলের প্রক্রিয়ার চাইতেও অনেক বেশি বিনিয়োগের বিষয়। এই বিনিয়োগে টাকা নয়, রক্তও প্রয়োজন হয়। তবে নির্বাচনের জন্য টাকা বিনিয়োগকারীরা নানা প্রক্রিয়ায় টাকা সংগ্রহ করেন জনগণের কাছ থেকে আর নির্বাচনের জন্য আন্দোলনেও রক্ত দেন জনগণ।
বাংলাদেশের জনগণকে বলা হয়, তারা রাজনীতিতে আগ্রহী এবং নির্বাচনপ্রিয় মানুষ। নির্বাচনকে রাজনৈতিকসচেতন ক্রিয়ার চাইতে উৎসবের আমেজে গ্রহণ করা হতো এ দেশে। কিন্তু নির্বাচন এখন এক মারমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম। নির্বাচন তা সে জাতীয় হোক আর স্থানীয় হোক, নির্বাচনের সময় এলেই এক অজানা আতঙ্ক ভর করে সাধারণ মানুষের মধ্যে। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেহেতু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত, তাই এই নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা এবং আতঙ্ক থাকে চরমে। স্বাধীনতার পর গত ৫২ বছরেও জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত করার কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নির্ধারণ করতে না পারার কারণে প্রতিটি নির্বাচনের আগে উত্তেজনা আর নির্বাচনের পরে প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ফলে মেয়াদি জ¦রের মতো বছরব্যাপী উত্তাপ আর নির্বাচনের আগে তীব্র কাঁপুনি তৈরি হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে।
কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন এবং আগ্রহ থাকলেও আতঙ্ক ঘনীভূত হচ্ছে, ২৮ অক্টোবরের পর কী হবে সেটা নিয়ে। ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই দল সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে সর্বাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে পড়েছে। তাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তেজনার পারদ ক্রমেই চড়ছে। নেতাদের কথা শুনে কর্মীরা রাজনীতিসচেতন না হয়ে বরং উত্তেজিত কর্মী হয়ে পড়ছেন। যেমন ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আন্দোলনকারীদের মাথায় ইউরেনিয়াম ঢেলে দেওয়া হবে আর আন্দোলনকারীরা বলছেন, পায়ের নিচে মাটি থাকবে না। একপক্ষের মুখপাত্র বলছেন, সমাবেশের অনুমতি না দিলে অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়ব, তখন টের পাবেন। অন্যপক্ষ বলছেন, অলিতে গলিতেও পালাবার পথ পাবেন না। একপক্ষ বলছেন, আর ছাড় নয়, আক্রমণ হলে পাল্টা আক্রমণ হবে। অন্যপক্ষ বলছেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে আঘাত হলে তারাও পাল্টা আঘাত করবেন। এ ধরনের বক্তব্য, পাল্টাবক্তব্য শুনে সাধারণ মানুষ গালে হাত দিয়ে ভাবতে পারেন, কী বলছে এসব! এগুলো কি রাজনৈতিক সমাবেশের প্রস্তুতিমূলক কথা নাকি যুদ্ধে লিপ্ত দুপক্ষের রণহুঙ্কার? ছাড় দেওয়া হবে না বা ছেড়ে দেওয়া হবে নাএই হুমকির প্রধান বলি হবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।
পুলিশ কর্র্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি। বিএনপি ঢাকার নয়াপল্টনে মহাসমাবেশের অনুমতি পাক বা না পাক, যে কোনো মূল্যে তাদের মহাসমাবেশ করার চেষ্টা করবে সে ঘোষণা দিয়েছে। পুলিশ কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, নয়াপল্টন ছাড়া অন্য কোথাও সমাবেশ করার আবেদন করবে না। এর আগে সমাবেশগুলো নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণভাবেই তারা করেছিল। তবে মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে বাধা এলে এবার প্রতিরোধ গড়ে রাজপথে টিকে থাকার চেষ্টা তারা করবে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ করতে চান। তবে বাধা এলে এবার প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
এই মহাসমাবেশ কি আন্দোলনের সমাপ্তি? না। ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ থেকে বিএনপি ঢাকায় সচিবালয় মুখে পদযাত্রা বা ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি নেওয়ার চিন্তা করছে। কর্মসূচি চূড়ান্ত না করলেও দলটির নেতারা বলছেন, মহাসমাবেশের পর তাদের টানা কর্মসূচি থাকবে। মহাসমাবেশ মোকাবিলায় ক্ষমতাসীন দল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী ভূমিকা পালন করে সম্ভবত তা দেখেই পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করবে দলটি। দলের নেতাকর্মীদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে নির্দেশনা দিয়েছে তারা। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও ২৮ অক্টোবর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করবে, এমন ঘোষণা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ নিয়ে। জামায়াতের ভূমিকা এবং রাজপথে নামার ঘোষণা নানা জল্পনার জন্ম দিচ্ছে। সবদিক বিবেচনায় এটা পরিষ্কার যে, মহাসমাবেশ করতে পারুক আর নাই পারুক, বিএনপি তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা দেবে।
আওয়ামী লীগ কি বসে থাকবে? তারা ২৮ অক্টোবর এবং এর পরবর্তী দিনগুলোকে ‘স্পর্শকাতর’ সময় হিসেবে দেখছে। মূলত ঢাকায় মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে বিএনপির বিপুল প্রস্তুতি, জামায়াতসহ অন্যান্য দলেরও একই দিনে সমাবেশ করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে ক্ষমতাসীন দল। ফলে রাজধানী ঢাকার রাজপথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনে ‘আক্রমণাত্মক’ হওয়ারও প্রস্তুতি নিতে বলেছেন গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। আওয়ামী লীগ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে সমাবেশ করবে। তাদের দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রস্তুতি সভায় কেন্দ্রীয় নেতারা কোনো ছাড় না দিয়ে ‘আক্রমণাত্মক’ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘২৮ অক্টোবর ঢাকার প্রতিটি রাস্তায় হাঁটতেও যেন আওয়ামী লীগ, সামনে আওয়ামী লীগ, পেছনে আওয়ামী লীগ থাকতে হবে। সারা শহরে আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ থাকবে।’ স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘ওই দিন কেউ যদি অশান্তি করতে আসে, খবর আছে। অনেক সহ্য করেছি, সহ্যেরও একটা সীমারেখা আছে।’
তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে ২৮ অক্টোবরের সমাবেশে ১০-১২ লাখ লোক জমায়েতের। সমাবেশে আসা নেতাকর্মীদের খালি হাতে না আসারও নির্দেশনা দেওয়া হয়। সবাই যেন আড়াই থেকে তিন হাত লম্বা লাঠি হাতে আসেন, সেই পরামর্শ দিয়েছেন কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতা। কোনো লাঠির মাথায় থাকবে জাতীয় পতাকা। কোনো লাঠির মাথায় থাকবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নানা স্লোগানসহ নানা প্রচারণা। জাতীয় পতাকা বা স্লোগান যাই হোক না কেন, প্রধান বিষয় হবে লাঠি হাতে মাঠে থাকা, নিজেদের ভরসা দেওয়া আর প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো।
সমাবেশ নিয়ে এত উত্তেজনার কারণ কী? প্রথমত দুপক্ষই দেখাতে চায় তাদের শক্তি। এই শক্তি দেখিয়ে নির্বাচন স্থগিত করার ভাবনা যেমন আছে, আবার যে কোনোভাবেই নির্বাচন করে ফেলার তাগিদও আছে। বিদেশিদের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যে আগ্রহ এবং মতামত সেক্ষেত্রে তাদের কাছে গুরুত্ব পেতে হলে জমায়েত ক্ষমতা দেখাতেই হবে। নভেম্বরে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত ফয়সালা করার চেষ্টা থাকবে উভয়পক্ষই। আওয়ামী লীগের নেতারা ভাবছেন, তফসিল ঘোষণার আগে বিএনপিকে একটা ধাক্কা দিতেই হবে। নতুবা তারা নির্বাচন বানচালের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশ বানচাল করতে পারলে তারা আর সংগঠিত হতে পারবে না। তখন তফসিল ঘোষণা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের চ্যালেঞ্জ কমে যাবে। তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলেই নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু হবে তাতে বিএনপির অনেকেও হয়তো নির্বাচনে আগ্রহী হবে, ফলে বিএনপিতে বিভক্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে। আর বিএনপি নেতারা ভাবছেন, ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু, ধাক্কা দেওয়া চলবে তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত। যাতে নির্বাচন নিজের মতো করে অনুষ্ঠিত করতে না পারে আওয়ামী লীগ।
কিন্তু এর ফলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে? অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন তুলে কর্মীদের উত্তেজিত করা বা আতঙ্কিত করার ফল কী হবে? যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে একতরফাভাবে করে নিতে পারে তাহলে কি অশান্তি দূর হবে? যদি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে হেরে যায় তাহলে কি অরাজকতা কমবে? দুটো ক্ষেত্রেই উত্তর একই। রাজনীতিতে সহিংসতা কমবে না, অর্থনীতির ঘনীভূত সংকট দূর করার পথ আরও জটিল হবে। আরেক অজানা আশঙ্কার কথা কি বাতাসে ঘুরছে না? দেশ কি আরও গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে?
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতি পাঁচ বছর পর পর কি দেশ এই সংকটের মুখে পড়বে? ‘নির্বাচন’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ হয়ে উঠতে পারছে না কেন? ‘নির্বাচন’ আর কতদিন জনগণকে শোষণ করা টাকায়, আন্দোলনে জনগণের রক্তে, জনগণের ভোটে বা ভোট ছাড়াই পাঁচ বছর জনগণকে শাসন করার বৈধতা গ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে? ক্ষমতা, দুর্নীতি আর দমনপীড়ন কি একে অপরের পরিপূরক হয়ে থাকবে? ২৮ অক্টোবর এবং তার পরবর্তী সহিংসতার আশঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রশ্নও জাগছে মানুষের মনে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে নিরপেক্ষ সরকার যেমন দরকার, তেমনি নির্বাচন পদ্ধতিরও সংস্কার করে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি চালু করা এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratanspb@gmail.com