বর্তমান সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বিরোধী দল বিএনপির আজ শনিবারের মহাসমাবেশকে সামনে রেখে গ্রেপ্তার এড়াতে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা গতকাল শুক্রবার নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এড়িয়ে চলেছেন। মহাসমাবেশের আগে গ্রেপ্তার এড়াতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অযথা নেতাকর্মীদের কার্যালয়ের সামনে ভিড় না করার নির্দেশনা দেন। এরপরও তৃণমূলের উৎসুক বহু নেতাকর্মী গতকাল সকাল থেকেই ভিড় করতে থাকেন দলীয় কার্যালয় ও আশপাশের এলাকায়। বিকেল থেকে নেতাকর্মীদের এ ভিড় বাড়তে থাকে। রাতে নেতাকর্মীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। তাদের স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে দলীয় কার্যালয় ও আশপাশ এলাকা।
দলীয় কার্যালয়ের সামনে ভিড় করা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানান, তারা বর্তমান সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে অনড়। এ দাবি আদায়ে আজকের মহাসমাবেশ থেকে শীর্ষ নেতাদের দেওয়া নতুন কর্মসূচি ও নির্দেশনা নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরবেন। উজ্জীবিত এসব নেতাকর্মীকে কাউকে কাউকে সেলফি তুলতে কিংবা দলীয় কার্যালয়ের সামনের চিত্রের ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। কেউ আবার ব্যস্ত ছিলেন ফেসবুক লাইভে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দলীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশের অনুমতি না দেওয়া ও গণহারে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানাতে গতকাল সকালে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আসেন মির্জা ফখরুলসহ দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা। সংবাদ সম্মেলনের পর জ্যেষ্ঠ নেতারা কার্যালয় ছেড়ে চলে যান। জুমার পর কার্যালয় ছাড়েন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। এরপর কার্যালয় হয়ে যায় নেতাশূন্য। এ ফাঁকে সকাল থেকেই সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মীরা সংবাদ সম্মেলন কক্ষে নেতাদের চেয়ারে বসে ছবি তোলেন, কেউবা তোলেন সেলফি। কেউ আবার ভিডিও করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতে দেখা গেছে। কেউ কেউ আবার ফোনে স্থানীয় নেতাকর্মী ও স্বজনদের কার্যালয়ে পৌঁছে ছবি তোলা ও ঢাকায় আসার কথা জানান।
মহাসমাবেশ ঘিরে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং আশপাশের গলিতে ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাজ করতে দেখা গেছে। বিকেলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমাবেশের অনুমতি প্রসঙ্গে নাইটিংগেল মোড়ে ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশপ্রধান (ডিবি) হারুন উর রশীদ উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই সমাবেশের অনুমতি পাবে। তবে স্থানের বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। স্থানের বিষয়টি খুব দ্রুতই জানিয়ে দেওয়া হবে তাদের।’
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কয়েকশ নেতাকর্মী রিকশা ভাড়া করে মিছিল করেন। এ সময় তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। আবার অনেককে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা ওড়াতে দেখা যায়। রিকশা মিছিলে অংশ নেওয়া নওগাঁ থেকে আসা যুবদল নেতা আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ঢাকায় এসেছি। কাল (আজ) সমাবেশ থেকে নেতাদের দেওয়া নতুন কর্মসূচি ও নির্দেশনা নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরব। আমরা ৫০ টাকায় রিকশা ভাড়া করে মিছিল করছি। আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবি জানাচ্ছি।’
দুপুর ২টার দিকে হোটেল ভিক্টরির সামনে ব্যাগ হাতে বসে থাকতে দেখা গেছে কুমিল্লার লাকসাম থেকে আসা কৃষক দলের নেতা লোকমান হোসেনকে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার এড়াতে সকালে একা একা গাড়িতে করে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় চলে এসেছি। ভ্রমণ করে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় হোটেলের সিঁড়িতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি। কিছুক্ষণ অবস্থান করে মিরপুরে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যাব। আগামীকাল (আজ) সকালে মহাসমাবেশস্থলে চলে আসব।’
খুলনার খালিশপুর থেকে আসেন রবিউল আলম। যুবদলের এ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসেছি। আজ (গতকাল) দুপুরে নয়াপল্টনে ঘুরতে এসেছি। দুপুরে মসজিদে নামাজ পড়েছি। এরপর কার্যালয়ে এসেছি ছবি তুলতে।’
রংপুর থেকে এসেছেন মহিলা দলের নেত্রী পলি আক্তার। কার্যালয়ের সামনে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় তাকে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছেছি। বাড্ডায় এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছি। দুপুরের পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসেছি। ঘুরে ফিরে দেখছি। সন্ধ্যার আগে চলে যাব। সকালে আবার আসব।’
গত বছর ১০ ডিসেম্বর মহাসমাবেশের আগে ৭ ডিসেম্বর দলীয় কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের কারণে এবার তৃণমূল নেতাকর্মীদের কার্যালয়ের সামনে ভিড় না করার অনুরোধ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এমনটা জানিয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা রিজভী আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিনভর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অভিযানের কারণে নেতাকর্মীদের কার্যালয়ের সামনে ভিড় না করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আগামীকাল (আজ) দুপুরে মহাসমাবেশে যোগ দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
নেতাকর্মীদের ভিড়ে কার্যালয়ের সামনের রাস্তা যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নেতা আব্বাস আলী একটি হ্যান্ডমাইক নিয়ে রাস্তায় নেমে আসা তৃণমূল নেতাকর্মীদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। পাশাপাশি কার্যালয়ের সামনে থাকা পুলিশ সদস্যদের দেখা গেছে রাস্তায় ভিড় করা নেতাকর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে।
সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নেতাকর্মীদের কার্যালয়ের সামনে ভিড় না করার নির্দেশনা থাকলেও সারা দেশের যেসব নেতাকর্মী ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছেন, তাদের অনেকেই কার্যালয়ে ভিড় করছেন। সময়ের ব্যবধানে এ ভিড় বাড়ছেই।’