ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক ও সরকারি গুরুত্ব পায়নি

দেশে চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পূর্বসতর্কতা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক মানের দিকনির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্ব পায়নি বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর অনৈতিক ও অমানবিক প্রবণতার কারণে সারা দেশে সর্বাধিক মৃত্যু ঘটেছে। অথচ ডেঙ্গু সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার দায় অনৈতিকভাবে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

গতকাল সোমবার ‘ডেঙ্গু সংকট প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। এই গবেষণায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নানা ঘাটতির পাশাপাশি ডেঙ্গু চিকিৎসায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিতে ২১ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

গবেষণা প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদনটি উপস্থাপনা করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন এবং রিসার্চ ফেলো রাজিয়া সুলতানা।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ধারাবাহিকভাবে সারা বছর জুড়ে থাকলেও এই রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক ও সরকারিভাবে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বিদ্যমান আইন অনুসরণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্র্তৃক সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুসরণ, যথাযথ সাড়া প্রদান, ডেঙ্গু সংক্রমণ চিহ্নিতকরণ ও সমন্বিত ডেটাবেস প্রণয়ন, মশা নিধন কার্যক্রমে সক্ষমতা, অংশীজনদের ভূমিকা ও সমন্বয়ের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

এমনকি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নিজেদের মধ্যে সমন্বয় না করে যার যার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলেও গবেষণায় বলা হয়েছে।

গবেষণার আওতাভুক্ত ১০ জেলার মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এখনো শুধু রাসায়নিক পদ্ধতির (লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড) মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় পাবলিক প্লেসে মশার প্রজনন স্থল ধ্বংস করা হলেও এখনো ঘরে ঘরে মশার প্রজনন স্থল চিহ্নিতকরণ ও ধ্বংস করার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

গবেষণায় উঠে এসেছে, মশা নিধনে কোনো কোনো এলাকায় ৫ থেকে ২৭ বছর ধরে একই কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য গবেষকদের মতে একই কীটনাশক বহু বছর ধরে ব্যবহারের ফলে মশা কীটনাশক সহনশীল হয়ে যায় এবং ওই কীটনাশক প্রয়োগে মশা নিধন হয় না। কোনো কোনো এলাকায় কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয় না। আবার অনেক এলাকায় কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হলেও সেখানে কীটতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকে না।

গবেষণায় আরও বলা হয়, ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থায় সক্ষমতার ঘাটতি প্রকট। বাংলাদেশে মোট ডেঙ্গু মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ষাটোর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের, ১৯ শতাংশ। এ ছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা অনুপাতে ষাটোর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের মৃত্যু হার অনেক বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধিবিষয়ক কার্যক্রম বা চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য সংকটকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা উঠে এসেছে গবেষণায়। বলা হয়েছে, মশা নিধনে দায়িত্বরত মাঠ কর্মীদের ১০০-৫০০ টাকা দিলে বাড়িতে গিয়ে ‘অধিক কার্যকর’ ওষুধ দিয়ে আসার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কীটনাশক কেনার ক্ষেত্রে একটি কীটনাশক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওপেন টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে তিনটি সিটি করপোরেশনের ১৬টি ক্রয়াদেশ পায়, যার মধ্যে সাতটিতে একক বিডার হিসেবে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি।

ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অনিয়ম-দুর্নীতি পেয়েছে টিআইবি। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ১০০ টাকার শিরায় দেওয়া স্যালাইন ৫০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুবিধা অপ্রতুল ছিল।

এ ব্যাপারে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রস্তাবিত কৌশল, দিকনির্দেশনা এবং কর্মপরিকল্পনা থাকলেও বাংলাদেশে তার কোনো প্রতিফলন ছিল না। ডেঙ্গু মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা, এমনকি কভিড সংকটসহ জনস্বাস্থ্যবিষয়ক নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হয়নি। সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করে কভিড সংকট মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতার প্রতিফলনও আমরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেখতে পারিনি।’

অনেক আগেই টিআইবির ডেঙ্গুকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট ঘোষণার আহ্বান আমলে নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান দায়সারাভাবে ভূমিকা পালন করেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রহণই করতে চায়নি। অন্য দেশ থেকে আমরা ভালো করছি এবং আমাদের উদ্বেগের কারণ নেইÑ সংসদে এমন কথা বলে আত্মতুষ্টিমূলক প্রচারণাও চালানো হয়েছে। অর্থাৎ ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যথাযথ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রাধান্য পায়নি। সমন্বয়হীনতার প্রকট উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।’

গবেষণা ফলাফলের আলোকে ২১ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হচ্ছেÑ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা ও মানদণ্ড অনুসরণ করে এডিস মশাসহ অন্যান্য মশা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ‘ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ প্রণয়ন করা; নিয়ন্ত্রণে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা, সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’ করা ইত্যাদি।

এ বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বোচ্চ ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০ জেলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা করা হয়েছে। জেলাগুলো হলোÑ ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, পটুয়াখালী, মানিকগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, পিরোজপুর, চাঁদপুর, ফরিদপুর ও কুমিল্লা।