বিএনপির মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় পুলিশ সদস্যকে হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলায় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল শুক্রবার শুনানি শেষে এ আদেশ দেন ঢাকা মহানগর হাকিম জাকী আল ফারাবী।
এদিকে বিএনপির গ্রেপ্তার হওয়া আরেক নেতা জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল একই আদালত এ আদেশ দেয়।
জানা গেছে, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও জহির উদ্দিন স্বপনকে গতকাল বিকেলে পুলিশ সদস্য হত্যা মামলায় আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের কারণ দেখিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক তরিকুল। অন্যদিকে এ দুই নেতার আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ ও শেখ শাকিল আহম্মেদ রিপন তাদের জামিন চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন মঞ্জুর না করে রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন।
এর আগে গত বৃহস্পবিার রাত পৌনে ১টার দিকে গুলশানের বাসা থেকে আমীর খসরুকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। একইদিন বিকেলে গুলশান থেকে জহির উদ্দিন স্বপনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পল্টন থানার ওসি সালাউদ্দিন মিয়া জানান, বৃহস্পতিবার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে বিএনপি নেতা মজিবর রহমান সরোয়ারকে পল্টন থানায় হওয়া পিস্তল ছিনতাই ও নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গতকাল তাকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন মডেল থানার এসআই ফরহাদ মাতুব্বর। তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে বিচারক আবেদন মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে একই আদালত নাশকতার অভিযোগে রাজধানীর পল্টন থানার মামলায় রিমান্ড শেষে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের ভাই ইশফাক হোসেনসহ ছয়জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরুকে তারা অনেক দিন ধরে খুঁজছিলেন। তিনি একটা বাসায় পালিয়ে ছিলেন, সেখান থেকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ হত্যার মামলায় আমীর খসরু চার নম্বর আসামি জানিয়ে হারুন অর রশীদ বলেন, ‘তাকে রিমান্ডে পেলে আমরা খতিয়ে দেখব, কাদের নেতৃত্বে, কাদের ইন্ধনে, কারা কারা ছিল কোন কোন স্টেজে সেগুলো খুঁজে বের করে বাকি যারা মামলার আসামি, তাদেরও আমরা গ্রেপ্তার করব।’
আদালতে যা বললেন খসরু : গতকাল আদালতে হাজিরের পর রিমান্ড শুনানিকালে আদালতের উদ্দেশে বেশ কিছু মন্তব্য করেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘জনগণকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় থাকতে বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবি ও বানোয়াট মামলা দিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করছে।’
শুনানির একপর্যায়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে আদালতের উদ্দেশে আমীর খসরু বলেন, ‘বিএনপি নয়, যাদের সঙ্গে জনগণ নেই তারাই সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে বিএনপির ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে। দেশের মানুষ বিএনপির সঙ্গে আছে। একটা সমাবেশ ডাকলে লাখ লাখ মানুষ আসে। সাইকেলে, নদী সাঁতরে, সরকারের হামলা-মামলা-ভয়ভীতি উপেক্ষা করে নেতাকর্মীরা বিএনপির সমাবেশে আসে। বিএনপির তো সন্ত্রাসী কার্যক্রম সহিংসতা করার দরকার নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটিই প্রথম বানোয়াট মামলা নয়, এরকম শত শত, হাজার হাজার গায়েবি ও বানোয়াট মামলা হচ্ছে। বাংলাদেশের ডিকশনারিতে (অভিধান) এখন গায়েবি মামলা নামে নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে। বিএনপির ৫০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা হয়েছে। পৃথিবীর আর কোথাও এমন গায়েবি মামলার নজির নেই।’
আমীর খসরু বলেন, ‘সরকার সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ দিশেহারা। এসব নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে।’
যুবদল নেতা মাসুদ রানার সন্ধান দাবি রিজভীর : গতকাল রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মুগদা থানার ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের (দক্ষিণ) সদস্য সচিব মো. মাসুদ রানার সন্ধান দাবি করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘গত ১ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সুতি কালভার্ট ধলপুর থেকে সাদা পোশাকধারী ডিবি পুলিশ গাড়িতে করে রানাকে তুলে নিয়ে গেছে। তার সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলও নিয়ে গেছে তারা। অথচ যুবদলের এই নেতাকে আটকের বিষয়টি এখন পর্যন্ত স্বীকার করছে না রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থা। তাকে এখনো জনসম্মুখে হাজির করেনি। এ অবস্থায় তার পরিবার চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে।’
রিজভী বলেন, ‘গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এগুলো সরকারের একমাত্র কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। দেশে গুম, অপহরণ বন্ধে বিএনপি বারবার সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে আসছিল। কিন্তু সরকার কর্ণপাত করেনি। আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য গুম এখনো অব্যাহত রাখা হয়েছে।’