ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল।বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তার স্বপ্নের কথা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমজাদ হোসেন হৃদয়
দেশ রূপান্তর : উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
অধ্যাপক মাকসুদ কামাল : আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছি। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছেন। এজন্য আমি দুজনের কাছেই কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডেকেছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তার প্রত্যাশা, এ বিশ্ববিদ্যালয় যেন একটি মানসম্মত জায়গায় উপনীত হয়। সেজন্য আমাদের সবাইকে ‘অ্যাজ এ টিম’ কাজ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তার এ পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করব।
দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
অধ্যাপক মাকসুদ : যেহেতু আমি প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছি, সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথায় গ্যাপ আছে, সেটা অ্যাড্রেস করে কাজ করা আমার জন্য সহজ হবে। কীভাবে শিক্ষার্থীদের মঙ্গল হবে, শিক্ষার পরিবেশ শিক্ষার্থীবান্ধব হবে এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি অবহিত আছি। আমরা যদি প্রাথমিকভাবে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আসবে। সেই পরিবর্তনের দিকে আমি প্রথম নজর দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্দিক থেকে খোলা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। আমি চেষ্টা করব এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও নজরে রাখব। আমাদের শিক্ষার্থীরাই হবে ক্যাম্পাসকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মূল নিয়ামক।
দেশ রূপান্তর : উপাচার্য হিসেবে আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে চান?
অধ্যাপক মাকসুদ : শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এখনো পর্যন্ত সেভাবে নিশ্চিত করতে পারিনি। এ কাজটি করার আমরা চেষ্টা করব। এ কাজটি করতে হলে কারিকুলাম পরিবর্তন করতে হবে। স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য কারিকুলামে কিছু কোর্স রাখতে হবে। এ কাজটি আমরা ইতিমধ্যে শুরু করেছি। এটিকে যাতে আরও বেশি করে বৈশ্বিক করা যায়, এটি আমাদের দেশের বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাজারমুখী যদি করতে পারি, তাহলে তারা কর্মক্ষেত্র হিসেবে শুধু বাংলাদেশকে বেছে নেবে না, তারা পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় গিয়ে কাজ করার সুবিধা পাবে। অ্যাকাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান আমরা শুরু করেছি। সেখানে এ বাস্তব বিষয়গুলোকে আমরা নিয়ে আসব। তাহলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে সহজেই প্রবেশ করার সুযোগ পাবে।
দেশ রূপান্তর : শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো গবেষণামুখী হয়ে উঠতে পারেনি এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?
অধ্যাপক মাকসুদ : বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্টে যেমন সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে, তার পাশাপাশি গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সাধারণত পৃথিবীর যে দেশগুলো আজ প্রতিষ্ঠিত, সে দেশগুলোতে আমরা দেখেছি, তাদের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করার যে ক্যাপাসিটি, সেটা সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মাধ্যমে। গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয় গড়াই আমার লক্ষ্য এবং এটি যুগের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু জ্ঞানের আধার হিসেবে ভাবলে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির পাশাপাশি জনকল্যাণমুখী করার জন্য কাজ করবে। এটাকে বলা হয় গবেষণার ইম্প্যাক্ট। অর্থাৎ গবেষণাটি সরাসরি সরকারের কাছে যাবে এবং তার মাধ্যমে সমাজের কাছে পৌঁছবে।
দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠে এটিকে ভালো পর্যায়ে নিতে আপনার পরিকল্পনা কী?
অধ্যাপক মাকসুদ : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে র্যাংকিং হয়, বিশেষ করে টাইমস হায়ার এডুকেশন, তাদের র্যাংকিংয়ের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। সেটা হলো তারা উচ্চশিক্ষার ইমপ্যাক্টটাকে বেশি বিবেচনা করে। তাই তাদের র্যাংকিংয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ থাকে রিসার্চ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ কোয়ালিটির ওপর। রিসার্চ কোয়ালিটি হচ্ছে যে গবেষণা সরাসরি মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে।
আমাদের অনেক গবেষণা হয়, অনেক পিএইচডি, এমফিল হয়। কিন্তু সেটার সরাসরি প্রয়োগ আমরা মাঠপর্যায়ে দেখি না, সমাজের পরিবর্তনের জন্য দেখি না। গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা এ পরিবর্তন আনতে চাই।
দেশ রূপান্তর : ২৮ বছরের অচলায়তন ভেঙে ডাকসু হলেও আবারও তা থমকে গেছে। আপনি কি এ নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেবেন?
অধ্যাপক মাকসুদ : আমি শিক্ষার্থীবান্ধব এবং নিজে নানাভাবে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে ওঠে। আমরা চাই নেতৃত্বের বিকাশ হোক। সময় সুযোগ হলে এবং অনুকূল পরিবেশ পেলে আমি সেদিকে মনোযোগ অবশ্যই দেব।
দেশ রূপান্তর : শিক্ষার্থীদের সব সমস্যার মূলে আবাসন সমস্যা এটি নিরসনে আপনার পরিকল্পনা কী?
অধ্যাপক মাকসুদ : আমাদের এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই বেশি। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসে। শহরে থাকার ব্যবস্থা না থাকায় তাদের হলে উঠতে হয়। হলে উঠে এক রুমে অধিকসংখ্যক ছাত্রকে থাকতে হয়। আমরা এটাকে অনেকে গণরুম বলি। এটা হলো বাস্তবতা। এ বাস্তবতার অবসান করতে হলে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। যেখানে নতুন হল উঠবে এবং রুমগুলোর এক্সটেনশন তৈরি হবে। এর মধ্য দিয়ে আমরা আশা করি গণরুম কালচারের অবসান হবে।