হাসপাতাল থেকে স্কুল কিংবা আশ্রয়শিবির, গত এক মাসে কোনো জায়গায়ই ক্ষণিকের জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাননি ফিলিস্তিনিরা। যেখানে গেছেন সেখানেই মৃত্যু তাদের পিছু নিয়েছে। মৃত্যুর পরিসংখ্যানও তাই আঁতকে ওঠার মতো, যা হিসাবের খাতায় ১০ হাজারের ওপর। অনেকে এমনও রয়েছেন, যারা ধ্বংসস্তূপের ভেতরে মৃত্যুগণনার তালিকায়ই ঠাঁই পাবেন না। বলা যায় সংখ্যা, ব্যাপকতা আর নৃশংসতায় গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি ইতিহাসের যাবতীয় সীমারেখাকে অতিক্রম করে ফেলেছে।
গাজায় গত ৭ অক্টোবর থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ইসরায়েল কতটা বীভৎস আক্রমণ চালিয়েছে, তা বোঝা যায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক মন্তব্য আমলে নিলে। গাজায় চার হাজারেও বেশি শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গাজা শিশুদের কবরস্থান হয়ে উঠেছে।’
তবে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধী জনমত, দেশ-বিদেশে সমালোচনা এবং বেসামরিকদের লাগাতার প্রাণহানির মধ্যে দমে যেতে নারাজ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির মতো কোনো পদক্ষেপে তার সায় নেই, বরং কিছু সময়ের জন্য হামলায় ‘কৌশলগত বিরতি’ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ধরনের বিরতি প্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে দুটি কারণও উল্লেখ করেন তিনি। সেগুলো হচ্ছে প্রথমত, উপত্যকায় সহায়তা পৌঁছার সুযোগ করে দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, হামাসের হাতে আটক থাকা বন্দিদের বের করে আনা।
সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন, যা নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। লিকুদ পার্টির এ নেতা বলেন, গাজা যুদ্ধ শেষে উপত্যকার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসরায়েলের হাতে থাকতে পারে। সাধারণত, পশ্চিম তীরে দখলদারি প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েল এ ধরনের কথা নিয়মিতই বলে। মূলত পশ্চিম তীরে ফাতাহনিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিন কর্র্তৃপক্ষের (পিএ) প্রশাসনের সমান্তরালে তেল আবিবের নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির বৈধতা দিতেই ইসরায়েলি প্রশাসন ওই ধরনের কথা বলে থাকে। সে ক্ষেত্রে গাজার ক্ষেত্রে একই রকম পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে উপত্যকায়ও দখলদারি প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে। উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকে স্বাক্ষরিত ‘অসলো শান্তি’ চুক্তির আলোকে পশ্চিম তীরের কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত পৌর এলাকার দায়িত্বে থাকবে পিএ। কিন্তু নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে ইসরায়েল।
স্কুল, ধর্মীয় কেন্দ্র, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স ও আশ্রয়কেন্দ্র কিছুই নেই হামলার বাইরে : ৭ অক্টোবরের পর এখন পর্যন্ত গাজার হাসপাতালসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও সুবিধাগুলোতে ২৭০টি হামলা চালায় ইসরায়েল। উপত্যকার ৩৫টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টি বন্ধ হয়ে গেছে। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে সৃষ্ট বিদ্যুৎ সরবরাহের বিঘ্ন ঘটা আর জ্বালানির অভাবে ভুগছে হাসপাতালগুলো। হামলার ভয় এবং ইসরায়েলি চাপে অনেক হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইসরায়েল মোটামুটিভাবে ৫৭টির মতো অ্যাম্বুলেন্সকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানায়। ৭২টি প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রের মধ্যে ৫১টিই কোনো কার্যক্রম চালাতে পারছে না। গাজার চালু থাকা হাসপাতালগুলোতে মৃত্যুর শঙ্কায় দিন পার করছে ইনকিউবেটরে থাকা ১৩০টি শিশু। ৫০ হাজারের মতো অন্তঃসত্ত্বা নারী ক্রমাগত বিপদের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন ১৮৩টি নবজাতক জন্মগ্রহণ করছে।
গাজার প্রশাসনের সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ২২ হাজার ৬০০টির মতো আবাসিক ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। ৯০ শতাংশ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ধ্বংস ও ক্ষতি করা হয়েছে। ৭০টির মতো শিল্প অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরায়েল হামলা চালিয়ে গাজার ৫৬টি মসজিদ ধ্বংস করেছে। জাতিসংঘ বলছে, গাজার ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত।
গাজায় মাস জুড়ে প্রতিদিন ১৬০ শিশুর মৃত্যু : প্রায় ২৫ লাখ জনসংখ্যার গাজায় মাসব্যাপী সংঘাতে নিহত ১০ হাজার ৩২৮ জনের মতো ফিলিস্তিনির মধ্যে শিশুই ছিল ৪ হাজার ১০০ জনের মতো। আগ্রাসনে নিহতদের ৪০ শতাংশই শিশু বলে দাবি করছে জাতিসংঘ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকায় প্রতিদিন ১৬০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
আবার হামাসনিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করছে, গাজায় ৭ অক্টোবরের পর প্রতি ১০ মিনিটে একজন ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেছে।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে আহত প্রায় ২৬ হাজার মানুষের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা প্রায় আট হাজারেরও বেশি এবং নারীদের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। বলে রাখা ভালো, গাজায় মাসব্যাপী সংঘাতের মধ্যে পশ্চিম তীরেও সমানতালে আক্রমণ চালিয়ে গেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। পশ্চিম তীরে মাস জুড়ে নিয়মিত সহিংসতায় ১৬৪ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারায়।
এখন যা চলছে : সোমবার দিনের পর রাতভর বিমান হামলায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছে। হামলা হয়েছে গাজার দক্ষিণেও। ইসরায়েল দাবি করছে, তারা রাতভর হামলায় হামাসের সন্ত্রাসী স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। মাস জুড়ে চলা যুদ্ধের মধ্যে সংঘাত আঞ্চলিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে ইরানসমর্থিত শিয়া মতাবলম্বী সশস্ত্র দল হিজবুল্লাহ থেমে থেমে ইসরায়েলে হামলা চালাচ্ছে এবং এর জবাবে বিমান হামলা এবং আন্তঃসীমান্ত আক্রমণ জারি রেখেছে ইসরায়েল। ইয়েমেনের শিয়া মতাবলম্বী গোষ্ঠীও ইসরায়েলে কয়েকবার ড্রোন হামলা করেছে। এ অবস্থায় যুদ্ধবিরোধী জনমত পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সমর্থনে কূটনীতি ও কৌশলগত তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইসরায়েলে অস্ত্র পাঠানো আটকাতে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে বিক্ষোভ : ফিলিস্তিনের পক্ষে গত সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের টাকোমা বন্দরে বিক্ষোভ চলছে। অস্ত্রবাহী মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ইসরায়েল-যাত্রা আটকে দিতেই এ বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীরা বলছে, জাহাজের অস্ত্র ইসরায়েল গাজার নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে।
টাকোমায় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ওয়াসিম হেজ নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধবিরতির দাবি জানাচ্ছি। আমরা মানুষ হত্যা বন্ধ করাতে চাই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আসল পরীক্ষা দেখতে চাই। আর ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল সরবরাহ বন্ধ করা হোক।’
টাকোমা বন্দরমুখী সড়ক বন্ধ করতে সেখানে এলোমেলো করে গাড়ি রাখে বিক্ষোভকারীরা। আরব রিসোর্সেস অর্গানাইজিং সেন্টারে (এআরওসি) এ প্রতিবাদ বিক্ষোভের আয়োজন করেছে।