‘আত্মপক্ষ ও অন্যান্য গল্প’ বইটা হাতে নিয়ে বসে আছি। বাইরে ঝড় হচ্ছে। বাতাস ও বৃষ্টির ছাঁট জানালায় আঁচড়ে পড়ছে বারবার। থেকে থেকে প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। অসংখ্য জানমালের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ একটু পরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে উঠবে। আমরা দেখেশুনে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যাব। কিন্তু যাদের গেল তারা কি আজ ঘুমাতে পারবে? যেসব পরিবার জানে না, তাদের স্বজন কোথায় আছে, কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা, কী অপরাধে নিখোঁজ, সেসব পরিবারের মানুষ কি দিনের পর দিন ঘুমাতে পারেন? ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওকে? কেন নিয়ে যাচ্ছেন?’ পড়লে মনে হয় একাত্তর ফিরে এসেছে আবার। তখনো এমন করে চোখ-মুখ বেঁধে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু সেই সময় আর আজকের সময় তো এক নয়। তাহলে এই অগণতান্ত্রিক আচরণ কারা করছে, কেন করছে? এ ব্যাপারে সরকারের জবাবদিহিতা বা আমরা জনসাধারণ প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছি কখনো?
কাকতাল কেউ ফিরে এলে তার মুখও বন্ধ থাকে। মুখ খুললে, ‘তুমি বাঁচতে পারবাই না, তোমার বউ-বাচ্চারেও তুইলা আনা অইব। বুজছো? কথাডা মনে রাইখো।’
তার মানে আমরা খুব বেশি এগোইনি, নানা দিক থেকে পিছিয়ে পড়েছি বললে অত্যুক্তি হবে কি?
গুম ও ঘুমের গল্প পড়ে জানালা খুলে থমকে দাঁড়িয়ে আছি, বৃষ্টি জলজ চোখ-মনকে আরও ভিজিয়ে দিচ্ছে; মনে মনে ভাবি, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর প্রিয়জনের পথ চেয়ে থাকা মানুষদের সহমর্মিতা জানানোর এ ছাড়া আর তো কোনো উপায় জানা নেই।
লেখক নিজেই একজন আপসহীন, ন্যায়নিষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। জগদীশ মাস্টার এখন কী করবেন গল্পে আদর্শ শিক্ষকের অন্দরমহলে ধর্ম কীভাবে আঘাত হেনে আদর্শ, বিশ্বাস, জন্মটান ওলটপালট করে দেয় তার নিখুঁত বিন্যাস দেখতে পায়। নিজের দেশে অস্তিত্ব সংকটে ভোগা মানুষের সংখ্যা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে বাড়ে বই কমেনি। তুলসীমঞ্চ ভেঙে, রাতের আঁধারে গোমাংস রেখে, যুবতি মেয়েকে তুলে নিয়ে হিন্দু তাড়ানোর কৌশল নতুন নয়। মাতৃভূমিকে আঁকড়ে পড়ে থাকা শিক্ষক জগদীশও তখন হয়ে যান ‘শ্লা, মালাউনের বাচ্চা’। বাম, ডান তখন একই সুরে কথা কয়। প্রগ্রেসিভ রাজনীতিকরা থিওরি কপচায়, ‘যতদিন সমাজের পরিবর্তন না হয়, সাম্প্রদায়িকতার উচ্ছেদ হইব না।’ কিন্তু এসব শুনে ভয় পাওয়া মানুষ আরও ভড়কে যায়। লেখকের ভাষায়, ‘ওগো তো ভয়ের মধ্যে, আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় না।’ আর তাই প্রতিদিন গড়ে ৭২ জন করে হিন্দু দেশত্যাগ করে। একটু স্বস্তি, নিরাপত্তায় বাঁচতে নিজেদের ভিটেমাটি-জমি ফেলে পরদেশে শ্যাওলার মতো বেঁচে থাকে, একসময় প্রচণ্ড অতৃপ্তি, মনঃকষ্ট নিয়ে মারা যায়। এটা কি কেবল মাইনরিটি কমপ্লেক্স? সব দেশে সব সংখ্যালঘুর মনে কি এটা নেই? থাকলে কেন আছে?
দেশে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন এখন রাজনীতির অংশ, সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে ডাল-ভাত।
আর তাই তথাকথিত শিক্ষিত, বন্ধুস্থানীয় মানুষও সান্ত্বনা দেওয়ার সময় তাদের শব্দমালার মধ্যে জগদীশরা যে এ দেশের নয়, তাদের জানমাল এখানে যে অনিরাপদ, তা প্রকাশ পায়। তাতে জগদীশরা চতুর্দিক থেকে ভেঙে পড়েন। শব্দচয়ন, বর্ণন, ভাব ও ঘটনার পরিমিতিবোধের দিক থেকে একে মাস্টারপিস গল্প বলা যায়। লেখকরা এখন বই বিক্রেতাও। নিজের ঢোল নিজে পিটিয়ে পরিচিতি পাওয়া, টাকা ঢেলে বা তেলবাজি করে পুরস্কার বাগিয়ে নেওয়া এখন সাদামাটা বিষয়, বরং প্রচারসর্বস্ব পথে না এগোলেই সেটা বেমানান, গোঁয়ার্তুমির শামিল। মোড়ক উন্মোচন গল্পে বর্তমান লেখক-সাহিত্যিকদের লোভাতুর অলেখকসুলভ মানসিকতার মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এটা লেখকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শনও নয় কি? লেখকের লেখকসত্তাকে চিনতে-জানতে এ গল্পটি পাঠ করা জরুরি।
সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা বাংলাদেশে এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা যায়নি। কিছুদিন আগে প্রকাশ করার তালিকায় দেখা গেছে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার বয়স ৫০-এর নিচে। ভাবা যায়! সুবিধাভোগী, উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরিরত বা অবসর নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া বর্তমান দেশ নিয়ে বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধা সন্তুষ্ট নন, এমন দেশ তারা চাননি। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সবারই জানা। কিন্তু কথা বলেন না কেউ, বলতে চাইলেও পারেন না। এই যে অপারগতা, মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা, কিংবা এসব যাতে দেখতে না হয় তার জন্য বিদেশে পলায়ন, এর কোনোটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে পড়ে না। আর তাই জীবনসংগ্রামে বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধা রফিক, জাহেদ, হায়দার ভুলে যায় তাদের সহযোদ্ধা রাজুর গ্রামের নাম, নানা বাড়িতে থাকা মায়ের একমাত্র কিশোর ছেলেসন্তান হওয়া সত্ত্বেও যে মুক্তিযুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে শহীদ হয়েছিল।
‘রাজুদের গ্রামের নামটা যেন কী? দৌলতপুরই তো? নাকি লালপুর? এত বছর পর মনে করাও কঠিন।’ আত্মপক্ষ গল্পে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর বিরূপ পরিস্থিতি অত্যন্ত ঋজু গদ্যে ফুটে উঠেছে। এ গল্পের একটা আলাদা টান আছে, সকরুণ সুর পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে।
আত্মপক্ষ ও অন্যান্য গল্প গ্রন্থে লেখকের বিভিন্ন সময়ে লেখা মোট চারটি ভিন্ন স্বাদের গল্প আছে, যা দেশীয় বিরূপ সময় ও সমাজকে ধারণ করেছে। লেখক মূলত প্রাবন্ধিক-গবেষক, কথাসাহিত্যে তার পদচারণা খুব কম, ওই গল্পগ্রন্থটি পড়ে এটা অনেকের সহ্য করা কঠিন হবে।
আত্মপক্ষ ও অন্যান্য গল্প॥ মোরশেদ শফিউল হাসান॥ প্রকাশক : আদর্শ॥ মূল্য : ১৬০ টাকা