বন্ধ ৯ পোশাক কারখানা আসামি ৪ হাজার

পোশাক শ্রমিকদের জন্য সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও জোটের নেতাকর্মীরা। ১২ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ন্যূনতম মজুরি ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এ ছাড়া সাম্প্রতিক আন্দোলনে তিন শ্রমিক নিহত হওয়ার দাবি করে এর বিচার চেয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত কর্মসূচি থেকে এসব দাবি জানানো হয়।

এদিকে অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের প্রেক্ষাপটে গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার নয়টি তৈরি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল সকাল থেকে এসব কারখানার সামনে বন্ধ ঘোষণার নোটিস ঝুলতে দেখা যায়।

অন্যদিকে কোনাবাড়ীতে পোশাকশ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের সময় পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরে ঘটনায় তিন-চার হাজারজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে মামলা হয়েছে।

সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করে বিভিন্ন দাবিতে গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পৃথকভাবে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মিছিল করে গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলন, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি, গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (জি-স্কপ), গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্ট এবং বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন।

এসব সংগঠন ও জোটের অন্যান্য দাবি হলো শ্রমিক আন্দোলনে আঞ্জুয়ারা, রাসেল ও ইমরান নিহতের বিচার ও হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত, শ্রম আইনের ১৩/১ ধারা বাতিল, ৫ ও ৬ নম্বর গ্রেড এবং শিক্ষানবিশ পদ বিলুপ্ত করে মজুরি কাঠামো নির্ধারণ, শ্রমিক আন্দোলন দমনে শক্তি প্রয়োগ বন্ধ করা, নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিকদের মুক্তি দেওয়া।

বেলা পৌনে ১১টার দিকে পল্টন মোড়ের দিক থেকে প্রথমে মিছিল নিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে আসে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট। পরে সংগঠনটি প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করে। সমাবেশে ফ্রন্টের নেতারা বলেন, শ্রমিকরা ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা প্রত্যাখ্যান করেছেন। অবিলম্বে সর্বনিম্ন মজুরি ২৩ হাজার টাকা ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়। এতে শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি খালেকুজ্জামান লিপন ও সাধারণ সম্পাদক সেলিম মাহমুদসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বেলা ১১টার দিকে পুরানা পল্টন থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে আসে বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন। তারাও ১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করে। এ সমাবেশে সংগঠনের নেতা তোফাজ্জল হোসেনের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন ও সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ দত্ত।

অন্যদিকে শ্রমিক ফেডারেশনের দাবি শ্রমিকদের মজুরি ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশে শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা বলেন, শ্রমিকরা ন্যায্যভাবে যখন মজুরির জন্য আন্দোলন করছেন, তখন সরকার মালিকদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাচ্ছে। ফেডারেশনের নেতারা আন্দোলনে নিহত তিন শ্রমিকের কথা উল্লেখ করে বিচার চান।

বেলা সোয়া ১১টার দিকে প্রেস ক্লাবসংলগ্ন ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে সমাবেশের জন্য দাঁড়ান ১১টি শ্রমিক সংগঠনের জোট গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের নেতারা। আগের দুটি সংগঠন সমাবেশ শেষ করলে তারা প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে সমাবেশ শুরু করেন। আন্দোলনে নিহত তিন শ্রমিকের কথা উল্লেখ করে তারা বিচার দাবি করেন।

সমাবেশে জোটের সমন্বয়ক তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘সরকার ও মজুরি বোর্ড বলছে ৫৬ ভাগ মজুরি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট ধরলে ৩৯ ভাগ হয়। এর থেকেও কমে আসে মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করলে। পেঁয়াজ ও আলুর দাম যে জায়গায় পৌঁছেছে, ১২ হাজার ৫০০ টাকায় শ্রমিকদের পক্ষে কোনোভাবেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।’

সমাবেশে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ, শ্রমিক নেতা সাদেকুর রহমান, মাসুদ রেজা, শবনম হাফিজ, বিপ্লব ভট্টাচার্য ও তফাজ্জল হোসেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের জোটভুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা ধাপে ধাপে পল্টনের দিক থেকে মিছিল নিয়ে প্রেস ক্লাবে এসে সমাবেশে যুক্ত হন। এসব সংগঠনের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন, রাষ্ট্র সংস্কার শ্রমিক আন্দোলন, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি।

সমাবেশে থেকে একই দাবিতে ১৪ নভেম্বর সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।

অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা ৯ কারখানা : শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে গাজীপুর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ২২টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে গতকাল গাজীপুরের প্রায় সব কারখানাতেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করে। কোনো পোশাক শ্রমিককে মহাসড়কে নামতে বা বিক্ষোভ করতে দেখা যায়নি। বন্ধ ঘোষণা করা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে তুসুকা জিন্স লিমিটেড, তুসুকা ট্রাউজার্স লিমিটেড, তুসুকা প্রসেসিং লিমিটেড, তুসুকা প্যাকেজিং লিমিটেড এবং নিডেল আর্ট এমব্রয়ডারি লিমিটেড। এ ছাড়া কোনাবাড়ী আমবাগ রোডের এমএম নিটওয়্যার লিমিটেড ও কোনাবাড়ী জরুন এলাকার ইসলাম গ্রুপের কারখানার এক নারী শ্রমিক আহত হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় ওই গ্রুপের তিনটি কারখানার সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশ জোন-২-এর অতিরিক্ত সুপার ইমরান আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, কোনাবাড়ী ও আশপাশের এলাকার ২২টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করার খবর তাদের কাছে রয়েছে।

পোশাকশ্রমিক-পুলিশের সংঘর্ষের সময় পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরে ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুর মহানগর পুলিশের কোনাবাড়ী থানার এসআই আবু সাঈদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। এ মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ ছাড়াও আরও তিন থেকে চার হাজারজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়।

এসআই আবু সাঈদ জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে কোনাবাড়ী এলাকায় তুসকা গার্মেন্টস কারখানার ভেতর শ্রমিকরা ব্যাপক ভাঙচুর করেন। এ সময় তারা ওই কারখানার সামনে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে থাকা গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনারের (ডিসি) গাড়ি ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১১ জনকে আটক করে। আটককৃতরা সবাই বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক। এ ঘটনায় করা মামলায় ওই ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গ্রেপ্তারদের গতকাল বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।