ভোটাধিকার, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বমুক্ত ক্যাম্পাস, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বে গঠিত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রঐক্য’ কার্যত কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আত্মপ্রকাশের পর মাত্র একটি কর্মসূচি পালন করতে পেরেছে এ ছাত্রজোট।
বিরোধী দলগুলোর সরকার পতনের চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু হলেও তাদের সমর্থনে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি এ জোট। নামসর্বস্ব ছাত্র সংগঠন নিয়ে ঐক্য করায় এ পরিস্থিতি হয়েছে বলে মনে করেন ছাত্র আন্দোলনসংশ্লিষ্টরা। ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রঐক্য’ যেন আলেয়ার আলো জ্বলে উঠেই নিভে যায়।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রঐক্য’। ৯ দফার ভিত্তিতে ১৫টি ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে এ ঐক্য হয়। এসবের বেশিরভাগই বামধারার ছাত্র সংগঠন এবং নামসর্বস্ব। ছাত্রদল ছাড়াও ঐক্যে আছে ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্রলীগ (জেএসডি), গণতান্ত্রিক ছাত্রদল (এলডিপি), নাগরিক ছাত্রঐক্য, জাগপা ছাত্রলীগ, ছাত্র ফোরাম (গণফোরাম মন্টু), ভাসানী ছাত্র পরিষদ, জাতীয় ছাত্রসমাজ (কাজী জাফর), জাতীয় ছাত্রসমাজ (পার্থ), জাগপা ছাত্রলীগ (লুৎফর) ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ, বিপ্লবী ছাত্র সংহতি ও রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলন।
ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের তেমন কোনো অবস্থান না থাকায় এবং ক্যাম্পাসের বাইরে জোট গঠন করায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল তারা আসলেই দাবি আদায় করতে পারত কি! দুই মাস না পেরোতেই সে প্রশ্নের বাস্তব উত্তর মিলেছে। দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি তারা। শিক্ষার্থীরা এখন বলছেন, লোক দেখানোর ছাত্রঐক্য লোক দেখানোতেই শেষ।
গঠনের পর ১২ অক্টোবর নিরাপদ ক্যাম্পাস ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ছাত্র কনভেনশন করে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রঐক্য। তাতে সরকার পতনের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালনের কথা জানিয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করার কথা থাকলেও সেটিও হয়নি। অনেকটা নীরবেই নিভে গেল জোটের আলো যেন আলেয়ার আলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহত্তর ছাত্রঐক্য গঠন করতে না পারায় এমন দুর্দশা হয়েছে। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ কয়েকটি ইসলামি ভাবধারার ছাত্র সংগঠনকে ছাত্রঐক্যে নেওয়ার কথা থাকলেও নেওয়া হয়নি কতিপয় বাম ছাত্র সংগঠনের বিরোধিতায়। নামসর্বস্ব কয়েকটি ছাত্র সংগঠনকেও জোটে নেওয়া হয়েছে। এদের ব্যানারে ৫-১০ জনের বেশি নেতাকর্মী দেখা যায় না। ছাত্রজোট হলেও ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কারোর তেমন অবস্থান নেই। এসব কারণে তারা সফলতার মুখ দেখেনি।
ছাত্রজোটে না থাকা একটি ছাত্র সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যথারীতিতে ছাত্রঐক্য গঠিত হয়নি। আমরা চেয়েছিলাম বৃহত্তর ছাত্রজোট করতে কিন্তু বাম সংগঠনগুলোর বাধায় সেটি করতে পারেনি ছাত্রদল। ছাত্রদল ছাড়া আন্দোলন করার মতো কোনো ছাত্র সংগঠনও নেই। সব বিরোধী ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে জোট করলে ভালো আন্দোলন গড়ে তোলা যেত। ছাত্রদলের জন্য এটি বড় ব্যর্থতা।’
ছাত্রজোটটির নেতারা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। তারা বলছেন, পরিকল্পনা থাকলেও ২৮ অক্টোবর থেকে সরকারের দমনপীড়ন ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করায় কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়নি। তবে তারা আলাদা আলাদা কর্মসূচি পালন করছেন এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন। তফসিল ঘোষণার পর ছাত্রদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের কথা ভাবছেন তারা।
ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রঐক্যের সমন্বয়ক ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মশিউর রহমান খান রিচার্ড দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশে সরকার যেভাবে পরিকল্পিত সহিংসতা করেছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমন করেছে, রাস্তায় নামলেই আটক করা হচ্ছে তাতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবু আমরা নিজ নিজ জায়গা থেকে এক দফা দাবিতে অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছি। ছাত্রঐক্যের ব্যানারে কীভাবে আন্দোলনে নামা যায় সে চিন্তাও করছি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ করব।’
জোটের আরেক সমন্বয়ক ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আদীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২৮ অক্টোবরের পর আন্দোলনের রূপ বদলে গেছে। মূল দলের অবরোধ কর্মসূচি থাকায় ছাত্রঐক্যের ব্যানারে আপাতত কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে না। তফসিল ঘোষণার পর ছাত্রদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে যাব।’
ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রঐক্যের মুখপাত্র ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাঈফ মাহমুদ জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির সরকার পতনের ধারাবাহিক কর্মসূচি থাকায় আমরা জোটগতভাবে কর্মসূচি দিতে পারিনি। তবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। সবাই আলাদা আলাদা আন্দোলন করছে। তীব্র আন্দোলন কিংবা গুলিবিদ্ধ হয়ে মিছিলে যেতে ছাত্রদল অভ্যস্ত। কিন্তু যাদের সঙ্গে ঐক্য করেছি তারা “নান্দনিক” প্রতিবাদে অভ্যস্ত। এখন তারাও মারমুখী আন্দোলনে আগ্রহী। আমরা ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচিতে যাব।’