এবারও রিটার্নিং অফিসার হতে পারেননি ইসির কেউ

আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিজস্ব কর্মকর্তারা। ইসি আয়োজিত সংলাপে অংশ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনরাও প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগের প্রস্তাব করেছিলেন। এ বিষয়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের এবং পরে আদালত রুলও জারি করেছিল। কিন্তু সেসবের কিছুই টিকেনি। আগের নির্বাচনগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও জেলা প্রশাসক বা ডিসিদেরই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার পরিপত্র জারি করেছে ইসি সচিবালয়।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, ৬৬ জেলার জেলা প্রশাসক বা ডেপুটি কমিশনার রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র ও সচিব মো. জাহাংগীর আলম বলেন, ‘জেলা নির্বাচন অফিসাররা নির্বাচনের সহায়ক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’

জানা গেছে, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাননি। ২০০৯ সালে এটিএম শামসুল হুদা কমিশন সিটি করপোরেশন প্রথমবারের মতো উপনির্বাচনে এই নিয়োগ দিয়েছিলেন। এরপর থেকে সিটি করপোরেশন ও সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে উপসচিব পদমর্যাদার আঞ্চলিক ও সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব দিয়ে আসছে ইসি। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজস্ব কর্মকর্তা দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করে ইসি।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) অনুচ্ছেদ ৭-এ বলা হয়েছে, কমিশন প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকা থেকে কোনো সদস্য নির্বাচনের উদ্দেশ্যে একজন রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করবে; এবং কোনো ব্যক্তিকে দুই বা ততোধিক নির্বাচনী এলাকার জন্য রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা যাবে। কমিশন প্রয়োজনীয়সংখ্যক সহকারী রিটার্নিং নিয়োগ করতে পারবে, তবে একজনকে একাধিক নির্বাচনী এলাকার জন্য নিয়োগ করা যাবে না।

সূত্রগুলোর মতে, জাতীয় নির্বাচন বিশাল কর্মযজ্ঞ। তাই এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে ইসি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কেননা, প্রশাসনের কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অন্যদের সঙ্গে যেভাবে যোগাযোগ রেখে নির্বাচন সম্পন্ন করেন, সেই দক্ষতা ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের ঘাটতি রয়েছে। জেলা প্রশাসকরা দায়িত্বে না থাকলে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের সহযোগিতায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এবারের নির্বাচন ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো মনে করছে ইসি। ফলে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিস্থিতি সহিংস হওয়ার আশঙ্কা করছে ইসি। সবদিক বিবেচনায় ডিসিদের বিকল্প খোঁজেননি ইসির দায়িত্বপ্রাপ্তরা। যদিও বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘদিন থেকেই নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার করার জোর দাবি জানিয়ে আসছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে সংগঠনটি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনবলের মধ্য থেকে অন্তত ৫০ শতাংশ রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। তখনো তাদের দাবি মানা হয়নি।

নির্বাচন কমিশন গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করে অন্যতম লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তাতে ‘নির্বাচন কমিশনের অধিকসংখ্যক যোগ্য কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। চলতি বছরের ২৬ অক্টোবর গণমাধ্যম সম্পাদকদের নিয়ে ‘দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন : গণমাধ্যমের ভূমিকা, জাতির প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় দেশের প্রধান কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাবেক নির্বাচন কমিশনারও এই দাবি জানিয়েছিলেন। গত ৪ নভেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির আলোচনায় বাংলাদেশ কংগ্রেসসহ কয়েকটি দল একই দাবি জানায়।

নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, বর্তমানে সারা দেশের মাঠপর্যায়ে ইসির ১০ জন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, ১৯ জন সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, ৪৫ জন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ৫১২ জন থানা/উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাসহ ৬৮৯টি কর্মকর্তার পদ রয়েছে। এ ছাড়া ইসি সচিবালয়েও শতাধিক কর্মকর্তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।

তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার এই দাবির পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে চায়নি ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের সংগঠনটি। সূত্রগুলোর মতে, নির্বাচনের পরিস্থিতি সহিংস হলে এবং এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে ব্যর্থ হলে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তারা অযোগ্য হিসেবে মূল্যায়িত হতে পারেন, যা ভবিষ্যতে তাদের জন্য নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করতে পারে। তাই এবার দাবির পক্ষে জোর দেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে সংগঠনটির মহাসচিব মো. হাসানুজ্জামান গত ৬ নভেম্বর সাংবাদিকদের বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার করার দাবিটি দীর্ঘদিনের। বর্তমান কমিশনের কাছেও এই দাবি জানানো হয়েছিল। তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে আর কোনো দাবি জানানো হয়নি।’

এদিকে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের ৬৪টি জেলা প্রশাসক এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুর রহমান। পরে ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জারি করা গেজেট কেন ‘অবৈধ, অসাংবিধানিক ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্টেও একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর ইসির জারি করা প্রজ্ঞাপনকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুর রহমান একই বছরের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিটে বলা হয়, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ইসির ৬৮৯ কর্মকর্তার মধ্য থেকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের ক্ষমতা ইসির হাতে। এর বাইরে অন্য কাউকে ওই দায়িত্ব দেওয়ার এখতিয়ার ইসির নেই।’

রিট আবেদনে আরও বলা হয়, ‘ডিসিদের নির্বাচন পরিচালনাকারী হওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদের কারণে এ সাংবিধানিক বাধা দেখা দিয়েছে। অথচ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা থাকার পরেও রিটার্নিং অফিসার হিসেবে ডিসিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেখানে স্বার্থ জড়িত, সেখানে সমাধান এত দ্রুত হয় না। এই কমিশন তো সরকারের আজ্ঞাবহ। সরকার চায়নি তাই তারা উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ডিসিরা এবারও দায়িত্বে থাকবেন। ডিসিদের দিয়ে সরকার যে কাজ করিয়ে নিতে পারবে, ইসির কর্মকর্তাদের সেটা করাতে পারে না।’