আজ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন ও অর্থ পাচার ঠেকাতে দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন করা হয়। এরপর নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে দেড় যুগের বেশি সময়। এ সময়ের মধ্যে প্রতিটি সরকারই দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স-নীতির কথা বললেও সংস্থাটির সাবেক অনেক কর্মকর্তা বলছেন, সংস্থাটির দুর্নীতি দমন কার্যক্রম চলছে ঢিলেঢালাভাবে। এর ফলে দুদক এখন আস্থাহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য, দুদক এখন রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত, প্রভাবিত হওয়ার কারণে দুর্নীতির রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। চুনোপুঁটি নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছে।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, ব্যুরো আমলে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ও রেলওয়ের জন্য দুটিসহ ৬৬টি কার্যালয় ছিল। ২০০৪ সালে ব্যুরো বিলুপ্ত করে কমিশন গঠনকালে ২২টি জেলা কার্যালয় রেখে বাকি ৪৪টি কার্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সংস্থাটির সাবেক ও বর্তমান কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, দেশের প্রতি জেলায় দুদকের নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় দুর্নীতি বেড়েছে। কোনো জেলায় দুদক কার্যালয় থাকলে অন্তত সে জেলার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ দুর্নীতিবাজদের মনে একটা ভয় কাজ করত।
তারা বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট থাকার কথা। কিন্তু কমিশন গঠনের ১৯ বছর পার হলেও সংস্থাটির নিজস্ব আইনজীবী প্যানেল নেই। সরকারি দলের আইনজীবীদের দিয়ে মামলা পরিচালনা করছে। সরকার সব ধরনের দুদককে ক্ষমতা দিয়েছে কিন্তু কমিশন এ-সংক্রান্ত একটি বিধিই প্রস্তুত করতে পারেনি। কেন কমিশন প্রসিকিউশন ইউনিট করতে পারছে না?
দেশের দুর্নীতি ও অর্থ পাচার বন্ধে দুদককে তেমন কোনো শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। বিগত কমিশনের আমলে দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দুদক আলোচনায় ছিল। সর্বশেষ গেল ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সময় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা নিয়ে দেশজুড়ে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে ঘুষখোর কর্মকর্তাদের ধরতেও ফাঁদপাতা অভিযান পরিচালনা করা হতো। কিন্তু বর্তমান কমিশনের সময় এ ধরনের কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। দেখা যায়নি হাইপ্রোফাইলের কোনো দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করতে। দুদক অনেকটাই নীরবে কাজ করছে। এতে করে দেশের দুর্নীতিবাজরা কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন বলে মনে করেন নেকে।
দুদকের একজন সাবেক মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ২০০৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন বিল পাস হয় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশ করা হয়। পরে ২০০৪ সালের ৯ মে কমিশন আইন কার্যকর করা হয় এবং ২১ নভেম্বর কমিশন গঠন করা হয়। দুর্নীতি দমন ব্যুরো আমলে দেশের ৬৪টি জেলায় একটি করে ও রেলওয়ের জন্য দুটিসহ ৬৬টি জেলা কার্যালয় ছিল। কমিশন প্রতিষ্ঠাকালে ২২টি কার্যালয় রেখে ৪৪টি জেলা কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। যেসব জেলায় অফিস নেই, সেখানে কী দুর্নীতি হচ্ছে না? হচ্ছে, তাহলে কেন দেশের সব জেলায় দুদকের কার্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে না। সরকার ক্ষমতা বিকেন্দ্রী করতে চায়। সরকার ২০১৮ সালে ১৪টি নতুন কার্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দেয়। এসব অফিস ২০২২ সালের শেষ সময়ে চালু হয়। সব মিলিয়ে এখন দেশের ৩৬টি জেলায় দুদক কার্যালয় রয়েছে। বাকি ২৮ জেলায় দুদক কার্যালয় নেই।
তিনি বলেন, সরকার যেখানে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলছে, সেখানে দুদকের বেলায় ভিন্নতা কেন? এর পেছনে কি কোনো কারণ আছে?
সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, আইনে কমিশন স্বাধীন সংস্থা হলেও যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের সমর্থিত দলের আইনজীবীরা দুদকের প্যানেল আইনজীবী হয়ে মামলা পরিচালনা করেন। অনেক সময় আইনজীবীরা আসামিদের সঙ্গে আঁতাত করেন। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ছাড়া কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। যদি কমিশনের নিজস্ব আইনজীবী হতেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত।
দুদক আইনের ৩৩ ধারায় বলা আছেÑ এই আইনের অধীন কমিশনের তদন্তকৃত বিশেষ জজ আদালতে বিচারযোগ্য মামলা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে কমিশনের নিজস্ব একটি স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট থাকবে। ওই প্রসিকিউশনের নিয়োগ ও চাকরি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। অথচ কমিশন গঠনের ১৯ বছর পার হলেও দুদকের নিজস্ব আইনজীবী প্যানেল গঠন করা হয়নি।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন), সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. মঈদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দুদক ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করলেও এর কাজ ছিল নামকাওয়াস্তে। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময় এর বিধি প্রণয়ন করা হয়। মূলত ওই সময়ই দুদক পুরোপুরি কাজ শুরু করে। জেলা ও বিভাগীয় অফিসগুলো কাজ শুরু করে। তবে জেলা অফিসগুলোকে কাজের ক্ষেত্রে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। প্রত্যেক জেলায় অফিস না থাকায় অভিযোগ দেওয়া কমে গেছে। এক জেলার মানুষ আরেক জেলায় গিয়ে অভিযোগ দিতে আগ্রহ দেখায় না। কমিশনের এখন জেলা অফিসগুলোর কীভাবে ক্ষমতা বাড়ানো যায়, কীভাবে সুপারভাইজ ও জবাবদিহির আওতায় আনা যায় তা করা উচিত।
তিনি বলেন, দুদক আইনে স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট থাকার কথা বলা আছে। সেটি এখনো হয়নি। দুর্নীতি কমাতে দুদকের মামলার নিষ্পত্তি ও সাজার হার বাড়াতে সংস্থাটির নিজস্ব আইনজীবী থাকা দরকার। তাদের দক্ষতা ও সততা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদক এখন আস্থাহীন প্রতিষ্ঠান। যেসব কারণে এই আস্থাহীনতার সংকটে পড়েছে, সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। যারা আসলে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তি, যাদের রুই-কাতলা বলা হয়, তাদের ক্ষেত্রে দুদককে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। তারা মূলত যারা চুনোপুঁটি তাদের নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছে।
তিনি বলেন, দুদক এখন রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রভাবিত হয়। যারা প্রভাবশালী তাদের ধরতে সাহস দেখায় না, মনে হয় হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে, এ রকম একটা মানসিকতা দুদকের রয়েছে। দুদক কিন্তু ক্রমাগতভাবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটা যতখানি না কমিশনের হাতে, তার থেকে বেশি প্রশাসনের হাতে। দেশের দুর্নীতি দমনে দুদককে সমস্ত প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে কাজ করতে হবে।
টিআইবি প্রধান আরও বলেন, দুদকের যেসব কর্মকর্তা ৬৪ জেলায় দুদকের অফিস থাকার কথা বলছেন, তারা ঠিকই বলছেন। দুদকের সারা দেশে কার্যালয়, জনবল ও প্রসিকিউশন ইউনিট থাকা প্রয়োজন। দেশে যেভাবে দুর্নীতি বাড়ছে, তাতে উপজেলা পর্যায়েও যদি দুদকের অফিস করা যায় তাহলে ভালো হয়। তবে অফিস করলেই তো হবে না, যদি জনবল দেওয়া হয়, তাদের কাজ করতে দেওয়া হয়, তাহলে দুর্নীতি দমনে সহায়ক হবে। তবে দুর্নীতি দমনে এগুলো যথেষ্ট নয়।
এদিকে ১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়সহ দুদকের সারা দেশের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ে মতবিনিময় সভার পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয় এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।