ডিজিটাল ব্যাংকে গুরুত্ব হারাবে না এজেন্ট ব্যাংকিং

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে এসেছে কেন্দ্রীয় বাংক। এরপরও সব গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে বিভিন্ন মাধ্যম নিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি চালু হতে যাওয়া ডিজিটাল ব্যাংক এমনই একটি মাধ্যম। তবে এতে প্রচলিত ব্যাংকিংব্যবস্থা বা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গুরুত্ব হারাবে না বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক এ জেড ভূঁইয়া আনাসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে গিয়ে কেন এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক?

মেজবাউল হক : কোনো ব্যাংক যখন শাখা খোলার মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দিতে যায় তখন তার বড় একটি স্থাপনার দরকার হয়। ওই শাখায় নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারী লাগে। তাদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে একটি শাখা চালু রাখতে ব্যাংকের অনেক বেশি খরচ বহন করতে হয়। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার বাজারগুলোতে সাধারণত ছোট ছোট লেনদেন হয়। ওইসব এলাকায় ব্যাংকের শাখা খুলে গ্রাহকদের সেবা দিতে গেলে ব্যাংকের জন্য লোকসানের কারণ হতে পারে। অর্থাৎ যেসব এলাকায় প্রি-কমিশন ইনকাম বেইজ কিছু সার্ভিস দেবেন তখন ওই শাখার খরচটা রিকভার করা কঠিন। কিন্তু সেখানেও তো আমাদের ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো দরকার। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক চিন্তা করে যে, আমরা সেখানে যদি ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে চাই তাহলে নতুন কোনো পদ্ধতি চালু করতে হবে। এরপর বিভিন্ন গবেষণা শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা হলো, যেখানে ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হবে। কিন্তু ব্যাংককে খুব বেশি খরচ গুনতে হবে না। অর্থাৎ এজেন্টের মাধ্যমে ব্যাংক যদি সেবা দেয় তাহলে অনেক কম খরচে গ্রাহকের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া যাবে। আবার এটাকে খুব দ্রুত প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এই চিন্তা থেকেই দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রচলন শুরু হয়।

এজেন্ট ব্যাংকিং প্রসারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে দিয়েছে। অর্থাৎ একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট পরিচালনার ক্ষেত্রে রিস্কগুলো কী কী হবে, কার কী দায়িত্ব হবে এবং কীভাবে এই ব্যাংকিংব্যবস্থা পরিচালিত হবেÑ সে বিষয়গুলো নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া কোন কোন সেবা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া যাবে, কোন কোন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করা যাবে, সে বিষয়গুলো নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নীতি সহায়তাই দিতে পারে, যেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময় দিয়ে যাচ্ছে। এরপরও যদি এজেন্ট ব্যাংকিং বিস্তারে ব্যাংকগুলো আমাদের কাছে কোনো প্রস্তাবনা নিয়ে আসে তাহলে আমরা তাদের প্রস্তাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে যাচাই-বাছাই করে দেখব। যদি সেখানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তারে ভালো কোনো প্রস্তাব থাকে সেগুলোকে আমরা নীতিমালায় যুক্ত করব এবং এজেন্ট ব্যাংকিং বিস্তারে সব ধরনের সহযোগিতা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডিজিটাল ব্যাংক কি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে?

বর্তমান প্রজন্মের গ্রাহকরা প্রযুক্তির মাধ্যমে আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও গ্রাহকদের একটি বড় অংশ সরাসরি ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে আগ্রহী। সব গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে বিভিন্ন মাধ্যম নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের কিছু কিছু গ্রাহক আছেন যারা ফিল করেন যে তিনি যেন সরাসরি ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারেন। কর্মকর্তাদের সঙ্গে যেন সরাসরি কথা বলতে পারেন বা দেখতে পারেন। তারা ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হলেও ব্যাংকের শাখায় বা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে যাবে। কারণ গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকরা টেকনোলজি থেকে ব্যাংকের বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে কম জানেন। তারা সরাসরি কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই আর্থিক পরামর্শ গ্রহণ করতে পছন্দ করেন। যেমন, কী ধরনের অ্যাকাউন্টে টাকা রাখবেন, কোন ধরনের সঞ্চয় হিসাব কিনবেন, তিন বছরের সঞ্চয় করবেন নাকি এক বছরের করবেন এ ধরনের পরামর্শ তারা ব্যাংকারদের থেকেই নিয়ে থাকেন। আবার কোন সেবায় তা কত মুনাফা বা কী কী শর্ত আছে তাও তারা সরাসরি জানতে চান। আবার যারা শিক্ষিত এবং তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান রাখেন তারা অনলাইনে তাদের প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজে নেন। তারা ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে তাদের সেবাটা নিতে বেশি পছন্দ করবেন। যারা ব্যাংকের লাইনে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চান না তাদের জন্যই ডিজিটাল ব্যাংক।

আমরা ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে অফ ব্রাঞ্চের যে সেবা দিতে যাচ্ছি সেগুলোর জন্য আলাদা কাস্টমার গ্রুপ আছে। আবার ফিজিক্যাল ব্রাঞ্চে গিয়ে যারা সেবা নেবেন তাদেরও আলাদা গ্রুপ আছে। সুতরাং আমরা মনে করি না যে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং বা প্রচলিত ব্যাংকিংব্যবস্থা কোনো ধরনের হুমকির মুখে পড়বে বা গুরুত্ব হারাবে। আমরা চাচ্ছি সব ধরনের গ্রাহককেই যাতে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা যায়। সে জন্যই বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং ইনোভেশন যুক্ত করা হচ্ছে।

ব্যাংকের সক্ষমতা কম থাকায় কৃষকরা মাইক্রো ফাইন্যান্স থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার ২২-২৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্টদের মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণে কোনো চিন্তা করছে কিনা?

ব্যাংকিং সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমরা কৃষকদের ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আরও সুবিধা যুক্ত হবে। কিন্তু এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকের শাখা বা এজেন্ট পৌঁছানো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। এই জায়গাটিতেই কাজ করছে বিভিন্ন ধরনের মাইক্রো ফাইন্যান্সগুলো। তাদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণে সুদের হার একটু বেশি। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে তাদের কৃষিঋণ বিতরণের শর্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংকগুলোকে তাদের নিজস্ব মাধ্যমে এখন থেকে ৫০ শতাংশ কৃষিঋণ বিতরণ করতে হবে।

গ্রাহকরা কেন ব্যাংকে না গিয়ে মাইক্রো ফাইন্যান্সের কাছে যাচ্ছে?

রেগুলেশনের জন্য ব্যাংকগুলোকে অনেক বেশি কমপ্লায়েন্স থাকতে হয়। এসব কমপ্লায়েন্স হয়তো মাইক্রো ফাইন্যান্সে থাকে না। অনেক সময় দেখা যায়, কৃষকরা যেই জমিতে চাষ করেন সেই জমি নিজের নয়। আবার নিজের হলেও সেই জমির দলিল অথবা কাগজপত্র সেভাবে ঠিক থাকে না। এসব গ্রাহক ব্যাংকে গেলে ব্যাংক তাদের ঋণ দিতে পারে না। কারণ ব্যাংকের থেকে ঋণ নিতে হলে বিভিন্ন শর্ত পূরণ করে ঋণ নিতে হয়। কিন্তু মাইক্রো ফাইন্যান্স থেকে ঋণ নিতে এই ধরনের কোনো শর্ত পূরণ করতে হয় না। তারা এসব ঝামেলা ছাড়াই কৃষকদের ঋণ দিয়ে থাকে।

আবার অনেক সময় দেখা যায়, ব্যাংকে থেকে ঋণ নিতে গেলে সিআইবি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া ব্যাংক ঋণ দেয় না। কিন্তু গ্রাহকের ঋণ দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজন। ব্যাংক সিআইবি ক্লিয়ারেন্সের জন্য দুই-একদিন সময় নেয়। কিন্তু মাইক্রো ফাইনান্সে গেলে তারা কোনো ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে ঋণ দিয়ে দেয়। এজন্য মানুষ মাইক্রো ফাইন্যান্সের দিকে ঝুঁকে। আবার ব্যাংকের কর্মকর্তারা মানুষের কাছে যান না। ঋণ নিতে হলে গ্রাহককে ব্যাংকে আসতে হয়। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের  কর্মকর্তারা গ্রাহকের কাছে তাদের বাড়িতে পৌঁছে যান। এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যা শুনে ও তাদের কাছে ঋণ বিতরণ করেন। ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং ও গ্রাহকের কাছে থাকলেও তারা একটি লোকেশনে গিয়ে তাদের সেবা নিতে হয়।