ব্যাংকিং সেবায় জনপ্রিয় মাধ্যম

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০২:১৪ পিএম

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি এজেন্ট ব্যাংকিং মূলত দেশের ব্যাংকিং সেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার একটি সময়োপযোগী সার্থক প্রয়াস। অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে প্রত্যেক নাগরিকের একটি ব্যাংক হিসাবের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সব শ্রেণি-পেশার জনগণকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে তৃণমূল পর্যায়ে শাখা বা উপশাখা ব্যাংকিংব্যবস্থা চালু করা দুরূহ এবং বেশ সময়সাপেক্ষ বিধায় এজেন্ট বা তৃতীয়পক্ষ নিয়োগের মাধ্যমে অনেকটা সহজতর হয়েছে। মূলত আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে বেগবান করতেই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার সূচনা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলাধীন সিরাজদীখান উপজেলার জৈনসার ইউনিয়নে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা প্রদান শুরু হয়। দি প্রিমিয়ার ব্যাংক ২০১৭ সাল  থেকে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা প্রদান করে আসছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শুরুর দিককার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে রিয়াজুল করিম বলেন, শুরুতে এজেন্ট ব্যাংকিং সম্পর্কিত ধারণা একদমই নতুন হওয়ায় গ্রাহকের কাছে বিশ্বাস অর্জন করাটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এছাড়া গ্রাম পর্যায়ে তখনকার ইন্টারনেট ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল থাকার কারণে নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিং পরিচালনা সম্ভব ছিল না। তবে বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং সাধারণ জনগণের কাছে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের জন্য অতি জনপ্রিয় একটি মাধ্যম।

এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সেসব নীতিমালা যথাযথ পরিপালন সাপেক্ষে স্থানীয়, সুশিক্ষিত, সমাজে গ্রহণযোগ্য এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এজেন্ট নিয়োগ করা হয়ে থাকে।

পরিচালন ব্যয় কমাতে এজেন্ট ব্যাংকিং কতটা সহায়ক এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অবদান রাখার উদ্দেশ্যে এবং ব্যাংকিং সেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী বা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেওয়া শুরু করে। এখানে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় সংকোচন মূল উদ্দেশ্য নয়। তবে তৃণমূল পর্যায়ে শাখার মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করতে গেলে যে পরিচালন ব্যয় বহন করতে হতো, প্রত্যন্ত গ্রামে এজেন্টের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের কারণে সেই ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হচ্ছে। ফলে অল্প খরচে গ্রাহককে বাংকিং সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে।

বর্তমানে দি প্রিমিয়ার ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেট থেকে নগদ জমা, উত্তোলন, ফান্ড ট্রান্সফার, বৈদেশিক রেমিট্যান্সের অর্থ প্রদান, বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল গ্রহণসহ কৃষক/ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করে আসছে। ভবিষ্যতে এজেন্টদের মাধ্যমে ই-কমার্স সেবা, সাপ্লাই-চেইন ম্যানেজমেন্ট, স্কুল ম্যানেজমেন্ট (পে-রোল থেকে বিভিন্ন ফি আদায়), কিউআর কোডের মাধ্যমে ব্যাংকিং-সহ সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা প্রদান করা যেতে পারে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকদের জন্য অতিরিক্ত কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন, এজেন্ট আউটলেটের সব লেনদেন গ্রাহকের আঙুলের ছাপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় এবং প্রতিটি লেনদেনই রিয়েলটাইমে হয়ে থাকে। কম্পিউটার জেনারেটেড প্রিন্টেড জমা/উত্তোলন রসিদ এবং এসএমএস-এর মাধ্যমে টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন দ্বারা গ্রাহককে সব লেনদেন নিশ্চিত করা হয়। গ্রাহকের অসাবধানতা না থাকলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকের লেনদেন ও আমানতের শতভাগ নিরাপত্তা রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে। তবে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গুরুত্ব কমবে না বলে মনে করেন তিনি। এজেন্ট ব্যাংকিং মূলত প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে জানিয়ে রিয়াজুল করিম বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকের লক্ষ্য ভিন্নমুখী এবং বাস্তবতার নিরিখে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে এর কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।

বর্তমানে দি প্রিমিয়ার ব্যাংক ৩২ জেলার ৯১টি উপজেলায় মোট ১৬০টি আউটলেটের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে, যেখানে গড় দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা, যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এজেন্টদের মাধ্যমে এসএমই ঋণ কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান ব্যাংকটির এই প্রধান নির্বাহী। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকদের শাখার মাধ্যমে ঋণ সেবা প্রদান করছি। আগামীতে এই সেবাকে এজেন্টের মাধ্যমে আরও বড় পরিসরে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু এসএমই নয়, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষিঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ এবং রিটেইল ঋণ প্রদানের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

৯ বছরে ব্যাংক গ্রাহকদের একটি বড় অংশ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বড় সফলতার জন্য দেশজুড়ে মেধাবী ও উদ্যমী উদ্যোক্তা তৈরি করে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত দ্বারা বাংকিং সেবা প্রদান করতে হবে। প্রয়োজনে এজেন্টদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃণমূলে উন্নয়নের সুফল পৌঁছাতে এজেন্ট ব্যাংকিং হতে পারে প্রধান মাধ্যম যা দিয়ে সরকারি বিভিন্ন সেবা পরিষেবাপ্রাপ্তি সহজসাধ্য হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত