বিশ্বে সর্বপ্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৯ সালে, ব্রাজিল থেকে। ব্রাজিলে ব্যাপক সফলতার ফলে আস্তে আস্তে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এবং পরে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এই চ্যানেলে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বরে এজেন্ট ব্যাংকিং সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করে এবং ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি চালু হয় নতুন ধাঁচের এই ব্যাংকিং সেবা। মূলত সুবিধাবঞ্চিত ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ যারা প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার অনেকটাই বাইরে তাদের জন্য এই এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা হয়।
এজেন্ট ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সেবা গ্রহীতাদের ব্যস্ত শাখাগুলোর পরিপূরক এবং অনেক ক্ষেত্রে সহজ মাধ্যমে সেবা দিয়ে থাকে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এজেন্টের সহায়তা নিয়ে থাকে যাতে অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো যায়। গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র গ্রাহকদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব কারণ লেনদেনের সংখ্যা এবং পরিমাণ কম থাকায় শাখা স্থাপন করে খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। এমন পরিবেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এজেন্ট নিয়োগ করে কম স্থাপনা খরচ ও পরিচালন ব্যয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা প্রদানের সুযোগ দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে খুব সহজেই ব্যাংকিং সেবা নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাদের নেই কোনো পরিবহন খরচ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ব্যাংকিং করার জন্য শহরেও যেতে হচ্ছে না, বাড়ির পাশে খুব সহজেই ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছে। আর এ চ্যানেলের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো খুব সহজেই কম খরচে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে পারছে।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শুরুর দিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গ্রাহকদের আস্থা অর্জন। যেহেতু গ্রাহক এই ধরনের এজেন্টভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলেন না, তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় আসত তারা তাদের টাকা নিরাপদ স্থানে রাখছেন কি না, লেনদেনে কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি না। এটি খুবই স্বাভাবিক এবং গ্রাহকদের আর্থিক সচেতনতা তৈরিও তাই আমাদের একটি মূল এজেন্ডা। বর্তমানে গ্রাহকদের মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়ে গেছে, যার ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাই যে বর্তমানে এই চ্যানেলে অ্যাকাউন্ট প্রায় ২ কোটি এবং মোট সঞ্চয়ের স্থিতি প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গেলে বলতে হবে গ্রাহকদের আরও বেশি সচেতন করে তোলা যাতে এই চ্যানেলটিকে ব্যবহার করে আর্থিক অনিয়ম, হুন্ডি, গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের মতো ঘটনাগুলো না ঘটে এবং উপযোগী বাজারে সঠিক এজেন্ট নির্বাচিত করা হয়।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে শাখা ব্যবস্থাপনার মতোই সব ধরনের দৈনন্দিন ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা শাখা ব্যবস্থাপনার থেকেও অধিকতর সহজ। শাখা ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি লেনদেনে ব্যাংকের যে পরিমাণ খরচ হয় এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে প্রদানকৃত লেনদেনের খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপন করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে/ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করে ব্যাংকিং প্রসার সহজসাধ্য নয়। এছাড়াও নির্ধারিত ব্যাংকিং সময়-সীমার বাইরেও এমনকি ছুটির দিনেও ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা সম্ভব। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার বিপুল জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় এনে তাদের অর্থনীতির মূলধারায় সংযুক্তকরণ হলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কাজ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিরক্ষর মানুষজন যারা শাখায় যেতে চান না স্বাক্ষর করতে না পারার কারণে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে/নির্ভয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট/আঙুলের ছাপের দ্বারা ব্যাংকিং সেবা নিয়ে থাকেন।
এজেন্টদের মাধ্যমে বর্তমানে যেসব সেবা পাওয়া যায় ভবিষ্যতে আরও অনেক সেবা অন্তর্ভুক্তি করা যেতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তিক অথবা এসএমই এর ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের ঋণ প্রদানের জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট খোলা, সব ধরনের বিল প্রদান করা, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন এনজিও, এমএফআই, এনবিএফআই, ইন্স্যুরেন্সের সঙ্গে কাজ করার জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর বিনিময় (ইন্টারঅপারেবল লেনদেন মাধ্যম) এর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ দ্বারা এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেল হয়ে উঠবে আরও বেশি সক্ষম, যার উদ্দেশ্যে সব ব্যাংকই কাজ করে যাচ্ছে। এজেন্টদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আরও উত্তরোত্তর ব্যাংকিং সেবার অন্তর্ভুক্তি করা সম্ভব।
এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে আমরা এসএমই ঋণ সুবিধা কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই দিয়ে আসছি এবং এই চ্যানেলের মাধ্যমে এ ধরনের ঋণ সুবিধা প্রদানে আমরাই লিড ব্যাংক। বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিতে বিতরণ করা ঋণের ৬৩ শতাংশই ব্র্যাক ব্যাংকের। আগে আমাদের এসএমই গ্রাহকদের জন্য করেসপন্ডিং ব্যাংকে হিসাব খুলে এসএমই ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকতাম এবং এসব ঋণের কিস্তিও করেসপন্ডিং ব্যাংকে জমা করা হতো। কিন্তু এখন সারা বাংলাদেশের সব এসএমই ইউনিটগুলোতে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে এসএমই ঋণ সুবিধা দিয়ে আসছে, যার ফলে আমাদের করেসপন্ডিং ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা একদম কমে গিয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের গ্রাহকদের এসএমই ঋণ সুবিধা পৌঁছে দেব, যার জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং হবে অন্যতম মাধ্যম।
এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা প্রদানের ব্যবস্থা ও একে নিরাপদ করতে এজেন্ট ব্যাংকিং সফটওয়্যার (এবিএস) ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে অনলাইনে সরাসরি লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। দুই স্তরের নিরাপত্তা (টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) ব্যবস্থায় লেনদেনগুলোর নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। এই ব্যবস্থায় লেনদেন বা লেনদেনের অনুরোধ বৈধ করতে একটি বায়েমেট্রিক যন্ত্রে গ্রাহকের আঙুলের ছাপ নিতে হয়। লেনদেন সম্পন্ন হলে গ্রাহককে একটি সিস্টেম কর্তৃক মুদ্রণকৃত কপি ও মোবাইলে খুদেবার্তা পাঠিয়ে জানানো হয়। এর ফলে স্বাক্ষর বা লেনদেনের স্লিপ জাল করার কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
বর্তমানে আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রায় সব উপজেলাতেই আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এসব আউটলেটের মধ্যে সিংহভাগই গ্রামীণ এলাকাতে। আমাদের এখন লক্ষ্য হলো আরও বেশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে যাওয়া এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং সেবাকে পৌঁছে দেওয়া। এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে এখন দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকারও বেশি এবং এই সংখ্যাটি দিন দিন বাড়ছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এসব লেনদেনের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ লেনদেন হয়ে থাকে ব্যাংকিং সময়েরও পরে। আমাদের অনেক শাখা ব্যাংকিং গ্রাহকও এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলটি ব্যবহার করে থাকেন।