গ্রাহক সচেতনতায় আরও কাজ করতে হবে

সৈয়দ মিজানুর রহমান

উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এবি ব্যাংক লিমিটেড

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০৪:১৮ পিএম

বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার-সেই কারণে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শুরু থেকেই গ্রাহকদের আস্থা অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এজেন্ট ব্যাংকিংকে জনগণের কাছে একটি বিশ্বস্ততার জায়গায় পৌঁছে দেওয়া খুবই প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তার কারণেই আস্থার জায়গাটি সৃষ্টি করা এবং সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি করাটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই চ্যালেঞ্জ দুটো এখনো কিছুটা হলেও বিদ্যমান আছে বিশেষ করে গ্রাহক সচেতনতার বিষয়টিতে এখনো আরও অনেক কাজ করার আছে, যা কিনা প্রকৃতপক্ষে গ্রাহক আস্থার বিষয়টিতেও যথেষ্ট অবদান রাখবে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মাথায় রেখেই এজেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে এজেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং এজেন্ট ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য একজন কতটা আর্থিকভাবে সচ্ছল তা যাচাই বাছাই করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও আগ্রহী এজেন্ট ফৌজদারি আদালতে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত কি না, এলাকায় স্থানীয়ভাবে গণ্যমান্য বা সুপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কি না ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচিত এজেন্টের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং যেকোনো ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকাটাও বেশ জরুরি।

এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমাতে কীভাবে সহায়তা করছে এমন প্রশ্নের জবাবে এবি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাঠামোগত খরচ এবং প্রয়োজনীয় জনবলের খরচ এজেন্ট নিজেই বহন করে বিধায় এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনায় ব্যয়, সাধারণ ব্যাংকের তুলনায়  অনেকংশে কম বলে দেখা যায়। এছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে একটি ব্যাংকের পক্ষে নিয়মিত শাখা স্থাপন করে ব্যাবসায়িকভাবে লাভবান হওয়া প্রায় অসম্ভব হলেও একটি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই ব্যাংকিং পরিষেবা পৌঁছে দিতে পারা এবং একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করা খুব কঠিন কিছু নয়।

তিনি বলেন, সেবার পরিধি বাড়ানোর জন্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ঘরে বসেই অ্যাকাউন্ট খোলা, ই-কেওয়াইসি, ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ, কৃষিঋণ এবং এসএমই ঋণ ইত্যাদি পরিষেবা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়াও অন্যান্য দৈনন্দিন সেবাসমূহ যেমন ই-কমার্স সেবা অনলাইন টিকেটিং সেবা ইত্যাদি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আর্থিক পরিষেবাগুলোকে সবার কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ ত্বরান্বিত করার উদ্দেশে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং প্রবর্তিত হয় যা অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো ২০০০ এর মাঝামাঝি সময়ে শুরু করেছিল। এর মধ্যে ব্রাজিল এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত।

সাধারণ ব্যাংকগুলোর প্রচলিত শাখার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকিং পরিষেবা পৌঁছানো সম্ভব হয় না এবং সেটি আর্থিকভাবেও লাভজনক নয়- যেই কারণে ব্যাংক থাকার পরেও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এই সেবা চালু করা হয়। এই পরিষেবা চালুকরণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এ ব্যাংকার বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকের নিরাপত্তা একটি সাধারণ ব্যাংকের মতোই। মূলত এটি একটি প্রি-পেইড মডেলে চালিত হয়ে থাকে যেখানে আর্থিক লেনদেনের টাকা একজন এজেন্টকে অগ্রিম তার অ্যাকাউন্টে জমা করে রাখতে হয়। গ্রাহকের  সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে  এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের নিরাপত্তা অনেকাংশে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে অর্থ জমা রেখে হাতে লেখা জমা সিøপ নিয়ে প্রতারিত হয়েছেন যা কি না পকেট ব্যাংকিং হিসেবে পরিচিত। যে কারণে এই পকেট ব্যাংকিং রোধ করার লক্ষ্যে এবং গ্রাহকদের নিরাপত্তার স্বার্থে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হাতে লেখা জমা সিøপের ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া লেনদেনের পর ব্যাংক গ্রাহককে প্রতিটি লেনদেন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাহকের মোবাইলে এসএমএস প্রদান করে থাকে। আমরা সব গ্রাহককে অনুরোধ করব, প্রতিটি লেনদেন করে নিজ নিজ মোবাইলে লেনদেন সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে এজেন্ট আউটলেট ত্যাগ না করতে। গ্রাহক সচেতন হলে এজেন্টের পক্ষে প্রতারণা করা একদমই সহজ নয়। তাছাড়া, আমরা মনে করি অস্বাভাবিক মুনাফার আশায় অনেক গ্রাহক এজেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন, যা কিনা গ্রাহকের ব্যাংকিং নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়। 

ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের জন্য কোনো হুমকি হয়ে দেখা দেবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং আরও বৃদ্ধি পাবে। যেহেতু ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নিজস্ব কোনো শাখা বা কোনো ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো থাকবে না সেই কারণে নগদ জমা ও উত্তোলনের জন্য একটি মাধ্যম ব্যবহার করা ছাড়া কোনো উপায় নেই এবং এই কারণে আমি মনে করি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেল একটি বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

এবি ব্যাংকের এ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের ৪৯২টি উপজেলা আছে। আমরা চেষ্টা করছি প্রতিটি উপজেলায় আমাদের সেবা পৌঁছে দিতে। বর্তমানে আমাদের ১১০টি উপজেলায় উপস্থিতি রয়েছে।  প্রতি মাসে আমাদের এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে গ্রাহক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকা।

এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই কৃষিঋণ, এসএমই ঋণসহ মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ কার্যক্রম শুরু করেছি। খুব শিগগিরই আমরা আরও বৃহৎ পরিসরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দ্বারপ্রান্তে এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আরও নতুন নতুন কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছি।

সৈয়দ মিজানুর রহমানের মতে ব্যাংকিং একটি বিশ্বস্ততার বিষয়- যেখানে এজেন্টদের বিশ্বস্ততা এবং আস্থার জায়গা তৈরি করাটা জরুরি। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিশেষভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে স্কুল ব্যাংকিংকে জনপ্রিয় করার জন্য এবং মানুষের আস্থা অর্জন করার জন্য ব্যাংকগুলো প্রতিটা জেলাভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও একটি সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত