জান্নাতুল ফেরদৌস। জন্ম খুলনায়, ১৯৭৬ সালে। এরপর খুলনা বিএল কলেজে পদার্থবিদ্যায় ভর্তি হন ১৯৯৭ সালে। কিন্তু হঠ্যাৎই যেন সবকিছুতে ছন্দপতন ঘটে। এক অগ্নি দুর্ঘটনা তার শরীরের ৬০ শতাংশ ঝলসে দেয়। তখন জীবনের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কেমন হতে পারে? নির্দ্বিধায় বলা যায়জ্বা শারীরিক জটিলতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা আর পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ার কষ্টগুলোই শুধু হতে পারত জীবনের গ্লানি। কিন্তু নাহ! এসব কষ্টের নিয়তি মেনে নেননি জান্নাতুল।
ঘুরে দাঁড়ানোর ‘প্রতিশব্দ’ হয়ে আবির্ভূত হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌস বিবিসি প্রণীত সারা বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা, মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী আমাল ক্লুনি, বলিউড অভিনেত্রী দিয়া মির্জা, হলিউড অভিনেত্রী আমেরিকা ফেরেরা, ভারতের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হারমানপ্রিত কৌর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ তিমনিত গেব্রুসহ অনেকে।
জান্নাতুল বিকলাঙ্গ হয়েও নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন এবং নিজেকে একজন মানবাধিকার কর্মী, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তিনি বর্তমানে ‘ভয়েস অ্যান্ড ভিউস (ভি অ্যান্ড ভি)’ নামের সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সংগঠন আগুনের কবলে পড়া নারীদের নিয়ে কাজ করে। সংস্থাটি সেই সব নারীদের মূল স্রোতে ফিরে আসতে সহযোগিতার হাত বাড়ায়। এই স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে বিবিসির জান্নাতুলের সফল অভিযাত্রার কথাই তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অগ্নিদুর্ঘটনায় শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার ক্ষত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তিনি (জান্নাতুল) চলচ্চিত্রনির্মাতা, লেখক এবং অধিকারকর্মী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।’
দুর্ঘটনার কারণে ছেদ পড়া পড়াশোনার পর্বটা জান্নাতুল পরে আবারও শুরু করেন। ২০০৫ সালে তিনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। নানা জটিলতা সত্ত্বেও তিনি স্নাতক শেষ করেন। পরে তিনি খেয়াল করতে পারেন, আগুনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শরীরের চিকিৎসার জন্য তিনি পরিবারের বোঝা হয়ে উঠছেন। এরপর তিনি নিজের আর্থিক স্বাধীনতা খুঁজতে থাকেন। ফলে স্নাতক শেষ করার পর তিনি ব্রিটিশ মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যাকশন অন ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এডিডি)’-এ বাংলাদেশ শাখায় পেশাগত জীবন শুরু করেন।
জান্নাতুলের হাত ধরে সমাজের সুবিধাবঞ্চিতসহ নানা শ্রেণি থেকে আসা অগ্নিদুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা আশার আলো খুঁজে পায়। জীবনে বাঁচার উৎসাহ পায়। বিশেষ করে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের অনুপ্রাণিত করতে পেরেছেন সফলভাবে। জান্নাতুল নানামুখী কর্মকাণ্ড চালিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আরও উচ্চতর পড়াশোনা করেন। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন নিয়ে পড়াশোনা করেন। কাজ করেছেন আরও নানা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়।
জান্নাতুলের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে তার লেখক ও নির্মাতা জীবন। ২০১২ সালে তিনি তার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নীরবে’ নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম শারীরিক প্রতিবন্ধী চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে ২০১৬ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। এই চলচ্চিত্রে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই করা এক নারী চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। বলে রাখা ভালো, তিনি চলচ্চিত্রের ওপর নানা কোর্স করেছেন। ২০১৩ সালে ফিনল্যান্ডের একটি চলচ্চিত্র উৎসবে তার সিনেমা প্রদর্শিত হয়।
লেখক হিসেবেও জান্নাতুলের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ হয়েছে। তার মধ্যে তিনটি রয়েছে উপন্যাস। বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক আহমদ ছফার ওপর তিনি একটি বই লেখেন। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের সম্পাদিত বইয়ে বেশ কয়েকটি নিবন্ধও লিখেছেন তিনি।