প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পার করেও সংকটাকীর্ণ প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিশ্বমানের গ্রন্থাগার ও আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকা, আবাসিক হলে আসনস্বল্পতা, গণরুম কালচার প্রভৃতি সমস্যায় ভারাক্রান্ত উচ্চশিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানটি। দিনে দিনে সমস্যাগুলো প্রকটতর হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখনো মানবেতর জীবনযাপন করে, মানসম্মত শিক্ষায়তনিক পরিবেশ থেকে তারা এখনো বঞ্চিত। সমস্যা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) গ্রহণ করা হলেও তাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
জানা যায়, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ অর্জনের লক্ষ্যে প্রযুক্তিগত ও ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিবেচনা করে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয় ধরে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। পরিকল্পনার আওতায় ১৫ বছরে তিন ধাপে ৯৭টি ভবন নির্মাণ করার কথা।
২০২১ সালের ১১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আরও কয়েক জায়গায় সমন্বয় করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছেন।
নতুন করে ৯৭টি ভবন নির্মাণ, পুরনো ভবনগুলোর সংস্কার, টিএসসিকে আধুনিক করে গড়ে তোলা, লাইব্রেরি সংস্কার, বিদ্যুৎব্যবস্থাকে সোলার করা, শিক্ষার্থীদের হাঁটার জন্য আলাদা লেন করা, সাইকেল চলাচলের জন্য আলাদা লেন করা প্রভৃতি বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে এই মাস্টারপ্ল্যানে। তিন ধাপে যে ৯৭টি নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে, তার মধ্যে অ্যাকাডেমিক ভবন থাকবে ১৭টি, ছাত্রী হল ৮টি ও ছাত্র হল ১৬টি। এ ছাড়া ২২টি হাউজ টিউটর ভবন, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য ১২টি এবং কর্মচারীদের জন্য ৯টি ভবন। অন্য ক্যাটাগরির আরও ১৩টি ভবন।
বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা সংকট সমাধানের দাবিতে উপাচার্যের শরণাপন্ন হলে কিংবা আন্দোলনে নামলে, তাদের স্বপ্ন দেখানো হয় মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে সমস্যা আর থাকবে না। আশ্বাসের মুলা দেখিয়েই তাদের ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সিন্ডিকেট মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন করার চার বছর পার হলেও অগ্রগতি নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম ধাপের প্রকল্পও এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ওঠেনি। কবে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে তা স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষও জানে না। আশার প্রদীপ যদিও তারা জ্বালিয়ে রেখেছেন।
গত ২৩ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ হাজার ৯৮ জন শিক্ষার্থী বাড়লেও হলগুলোতে আসনসংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৫ হাজার ৬৯৬। আবাসন সংকটে প্রকটতর হয়েছে ‘গণরুম সংস্কৃতি’। ১০২টি গণরুমে মানবেতর জীবনযাপন করছেন প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী। গড়ে প্রতিটি হলে ছয়টির বেশি গণরুম। প্রতি রুমে গড়ে ২০ জন শিক্ষার্থী। ওইসব রুমে পড়াশোনা ও সুন্দরভাবে থাকার ব্যবস্থা নেই। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে এ সংকট অনেকটাই কমত।
লাইব্রেরি সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পড়ার জন্য একটি আসন পেতে ভোরবেলা থেকে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি শুরু হয়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কিছু শিক্ষার্থীর আসন মেলে হয়তো, এটিই নিত্যচিত্র। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে পর্যাপ্ত আসন ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা করার জন্য মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা। লাইব্রেরিতে বিদ্যমান সুবিধায় সর্বোচ্চ এক হাজার শিক্ষার্থী একসঙ্গে পড়তে পারেন। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে ৩ হাজার ১১০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে পড়তে পারবেন। বর্তমান তিনতলার পরিবর্তে হবে বিশালাকার বারোতলা ভবনের গ্রন্থাগার হওয়ার কথা রয়েছে, যার আয়তন ৯০ হাজার ৮৮ বর্গফুট।
আসন সংকটও অনেকাংশে কমবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মুর্তজা মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসাসেবা নিয়ে ক্ষুব্ধ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মেডিকেল সেন্টারটিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না। আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় দরকারি পরীক্ষার সুযোগও নেই। মেডিকেল সেন্টারে উন্নত চিকিৎসা ও সেন্টারটির আধুনিকায়নের দাবিতে অনশন করেছেন শিক্ষার্থী মহিউদ্দীন রনি। পরে উপাচার্য তার অনশন ভাঙান এবং তার দেওয়া ছয় দফা দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। এখনো সেসব পূরণ হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম নেই। বিশেষ করে কলাভবনে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হয় অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। বিনা নোটিসে রুম সিলগালা, পরিত্যক্ত রুমের তালা ভেঙে দখলের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ। পর্যাপ্ত ল্যাব, আধুনিক জিমনেশিয়াম, পার্কিং সুবিধাসহ যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ বেশ কিছু দাবি রয়েছে শিক্ষার্থীদের, যার সমাধান মাস্টারপ্ল্যানে রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। প্রশাসন আন্তরিক হলেই মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। একই দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলোর সমাধান দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারাও।
মাস্টারপ্ল্যানের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জাবেদ আলম মৃধা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্ভাব্য ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছিল। প্রথম প্রকল্পের কাজের একটা বাজেট দেওয়া হয়েছিল মন্ত্রণালয়ে। বাজার মূল্য বাড়ায় সেটি আবার সংশোধন করতে বলা হয়েছে। প্রথম প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বাজেট আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। এরপর এটি একনেকে উঠবে। একনেকে অনুমোদিত হলে, বাজেট পেলে কাজ শুরু হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন করেছে। সেটি প্রধানমন্ত্রীও দেখেছেন। সম্প্রতি এ বিষয়ে আমরা সভাও করেছি। আশা করি, দ্রুত প্রথম প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারব।’
মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিন ভাগে আমরা মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করব। প্রথম ভাগের কাজের জন্য বাজেট সরকারের কাছে দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী যদি আবার ক্ষমতায় আসেন তাহলে এ কাজের বাজেট আমরা পাব। প্রায়োরিটি অনুযায়ী আমরা কাজ করব। এটি হলে আমাদের শিক্ষার্থীদের সমস্যা অনেকাংশে কমবে। পর্যায়ক্রমে মাস্টারপ্ল্যানের সবকিছু বাস্তবায়িত হবে।’