শিল্পাঞ্চলে পানি দিতে চার লেক

শিল্পাঞ্চলে পানির জোগান দিতে পাহাড়ে হচ্ছে চার লেক। মিরসরাই ও সীতাকুন্ডের পাহাড়ি এলাকার ছড়াগুলোতে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম এসব লেক তৈরি করা হবে। শুষ্ক মৌসুম (মার্চন্ডমে) ছাড়া বাকি সময় এই চার লেক থেকে পানির চাহিদা পূরণ করা যাবে।

ইতিমধ্যে কয়েকটি শিল্পগ্রুপ নিজ উদ্যোগে কিছু লেক তৈরি করে নিজেদের চাহিদা পূরণ করলেও এবার সমন্বিতভাবে পুরো এলাকার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সীতাকুন্ডন্ডমিরসরাই এলাকার পাহাড়ে পরিচালিত সমীক্ষার ভিত্তিতে চলছে প্রকল্প তৈরির কাজ।

প্রকল্প গ্রহণের কথা স্বীকার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক এস এম শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সীতাকুন্ড এলাকার শিল্পাঞ্চলে পানির সমস্যা চলছে। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) মাধ্যমে একটি বিশদ সমীক্ষা চালানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সেই সমীক্ষার প্রতিবেদন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জমাও দেওয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে চারটি লেক তৈরির মাধ্যমে পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) তৈরির কাজ চলছে।’

সমীক্ষার বিষয়ে সমীক্ষা দলের প্রধান আইডব্লিউএমের বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক তরুণ কান্তি মজুমদার বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় পাওয়া গেছে সীতাকুন্ড ও মিরসরাই এলাকার ২৬টি পাহাড়ি ছড়ার মধ্যে চারটি ছড়াকে লেকে (রিজার্ভার) রূপান্তর করা যাবে। ওখানকার পাহাড়ি এলাকার পানি এসব লেকে জমা হবে। আর জমাকৃত পানি শিল্পকারখানা কিংবা কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে শিল্পাঞ্চলে যে চাহিদা রয়েছে সেই চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ সম্ভব। তবে আগামীতে শিল্প উৎপাদন বাড়লে সংকট হবে।’

এই এলাকার পানি সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি দীর্ঘদিনেও হয়নি। জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সীতাকুন্ড এলাকার পানির সমস্যাটি অনেক পুরনো। বর্তমানে আইডব্লিউএম যে স্টাডি (সমীক্ষা) করেছে তাতে প্রাথমিকভাবে হয়তো পানির জোগান দেওয়া সম্ভব। তবে শুষ্ক মৌসুমে (মার্চন্ডমে) কিছুটা সমস্যা হতে পারে।’

লেকের কি কোনো বিকল্প রয়েছে, এমন প্রশ্নে রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরেও পানির সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেখানে মেঘনা থেকে পানি আনা হচ্ছে। সীতাকুন্ড এলাকার শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য এমন উৎসও খুঁজে বের করতে হবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসারও উদ্যোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে এই এলাকার পানির সমস্যার জন্য চিটাগাং চেম্বার থেকে ওয়াসাকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে আমরা মেঘনা থেকে পানি আনতে প্রকল্প গ্রহণ করেছি। মিরসরাইয়ে দেওয়ার পর প্রথম পর্যায়ে আরও প্রায় তিন কোটি লিটার উদ্বৃত্ত থাকবে। আমরা এই উদ্বৃত্ত পানি সীতাকুন্ড ও মিরসরাই শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ করতে পারি। তবে এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।’

কোথায় হবে চার লেক মিরসরাইয়ের আমবাড়িয়া এলাকার গোভানিয়া ছড়া, কাঁঠালবাগান এলাকার খৈয়াছড়া ব্যবহার করে দুটো লেক এবং সীতাকুন্ডের ছোট কুমিরা ছড়া ও বড় কুমিরা ছড়া মিলে একটি লেক। এছাড়া সীতাকুন্ডের জোরামতল খাল ব্যবহার করে একটি লেক তৈরি করা যাবে বলে আইডব্লিউএমের সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এরমধ্যে মিরসরাই বাজার এলাকার গোভানিয়া ছড়ায় প্রায় ৪৬ বর্গ কিলোমিটার (ক্যাচমেন্ট এরিয়া) এলাকার পানি এসে জমা হবে। এই ছড়ার দৈর্ঘ্য ২৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার। মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়ার খৈয়া ছড়ায় পানি আসবে সাড়ে পাঁচ বর্গ কিলোমিটার এলাকার। ছড়াটির দৈর্ঘ্য সাড়ে ৭ কিলোমিটার। কুমিরা ছড়ায় আসবে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটারের এলাকার পানি। এ ছড়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪ কিলোমিটার এবং জোরামতল খালে ৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি এসে পড়বে। ছড়াটির দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার।

কী পরিমাণ পানি জমা হবে চার লেকে

চারটি লেক থেকে দিনে প্রায় তিন কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা যাবে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি পানি পাওয়া যাবে গোভানিয়া ছড়ায়। এর ধারণক্ষমতা হবে প্রায় দেড় কোটি লিটার। এছাড়া খৈয়া ছড়ায় ৩০ লাখ লিটার, কুমিরা ছড়ায় প্রায় ৪০ লাখ লিটার এবং জোরামতল খালের রিজার্ভারে ৮০ লাখ লিটার পানি ধারণ করা যাবে। এসব রিজার্ভারের উচ্চতা ধরা হয়েছে প্রায় ২০ন্ড২২ মিটার। কিন্তু এত উঁচু বাঁধ এই এলাকায় করা যাবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম ওয়াসার একজন উচ্চপদস্থ প্রকৌশলী বলেন, ‘এর আগে আমরাও একটি স্টাডি করেছিলাম। কিন্তু এসব লেক থেকে যে পরিমাণ পানি পাওয়া যাবে তা বাণিজ্যিকভাবে সাশ্রয়ী হবে না বলে আমরা প্রকল্প গ্রহণ করিনি।’

চট্টগ্রাম শহরের ফয়’স লেকও পানি সরবরাহের জন্য করা হয়েছিল। ১৯২৫ সালে ইংরেজ প্রকৌশলী মি. ফয় পাহাড়ি এলাকায় তিনটি বাঁধ দিয়ে এই লেক তৈরি করেছিলেন। এখন পর্যন্ত লেকের পানি পরিশোধন করে রেলওয়ে এলাকায় সরবরাহ হয়ে আসছে। এছাড়া মিরসরাইয়ে বাঁধ দিয়ে করা মহামায়া লেকের পানি সেচের কাজে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

সীতাকুন্ডে পানির স্তর অনেক নিচে

সীতাকুন্ড এলাকায় ভূন্ডগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে। আর ভূন্ডগর্ভস্থ পানি গভীর নলকূপের মাধ্যমে শিল্পকারখানাগুলো উত্তোলন করলে স্থানীয় অধিবাসীরা সুপেয় পানি পাবে না বলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সীতাকুন্ড এলাকায় ভৌগোলিকভাবেই ভূন্ডগর্ভস্থ পানি কম পাওয়া যায়। তাই নলকূপ বসালে মাটির অনেক নিচে যেতে হয়। আবার অনেক এলাকার মাটির নিচে পাথর রয়েছে।’

গত ২০ বছর ধরে সীতাকুন্ডন্ডকুমিরা ও ভাটিয়ারী এলাকায় নলকূপ বসানোর কাজ করে আসছেন নূর মোহাম্মদ নামের এক মিস্ত্রি। তিনি বলেন, সাগরের দিকে ১৫০ থেকে ২০০ ফুটের মধ্যে পানির লেভেল পাওয়া গেলেও পাহাড়ের দিকে (ঢাকান্ডচট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব দিকে) ৭০০ থেকে ৮০০ ফুট পর্যন্ত যেতে হয় পানির লেভেল পেতে।  

ছড়া থেকে পানি সংগ্রহ করছে শিল্প কারখানাগুলো

ইতিমধ্যে মিরসরাইন্ডসীতাকুন্ড এলাকায় কয়েকটি ছড়ায় বাঁধ দিয়ে এই এলাকার পানি ব্যবহার করছে কিছু শিল্পগ্রুপ। আবার কেউবা পাহাড় কিনে সেই পাহাড়ি উপত্যকায় লেক তৈরি করেছে। তবে লেকের এসব পানি শিল্পোৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়।

এ বিষয়ে রড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম’র সহকারী ব্যবস্থাপক মুনতাসির মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নিজেরা জায়গা কিনে কারখানা থেকে দূরে বিশাল জলাধার তৈরি করেছি। সেই জলাধারে বৃষ্টির পানি জমা হয়। জমাকৃত পানি কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করি। তবে শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা সমস্যা হয়।’

একইভাবে পাহাড়ি এলাকার ছড়ায় বাঁধ দিয়ে একেএস স্টিল, জিপিএইচ ইস্পাত, বিএসআরএম এমন জলাধার প্রস্তুত করেছে বলে আইডব্লিউএমের সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এসব এলাকার স্যাটেলাইট উপাত্ত ব্যবহার করে দেখা যায়, পুরো পাহাড়ি এলাকায় ২৬টি ছড়া রয়েছে। এসব ছড়া দিয়ে পাহাড়ি এলাকার পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। সীতাকুন্ড এলাকাটি খুবই সরু এলাকা। এর একপাশে পাহাড় ও অপর পাশে সমুদ্র। মধ্যবর্তী সরু জায়গার মধ্যে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এই এলাকার মধ্য দিয়ে গিয়েছে ঢাকান্ডচট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেললাইন।

চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিসংখ্যান অনুসারে এই এলাকায় প্রায় ৫৪০টি শিল্পকারখানা রয়েছে। অন্যদিকে কলকারখানা পরিদপ্তর অনুযায়ী, শিল্পকারখানার সংখ্যা ৫৭৫। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তথ্যমতে, ছোটন্ডবড় ৪৮০টি শিল্পকারখানার পাশাপাশি ১৭৯টি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড রয়েছে।

শিল্পগ্রুপ প্রতিনিধিদের বক্তব্য

লেক তৈরির মাধ্যমে সীতাকুন্ড এলাকায় পানি সরবরাহের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে রড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমন্ডএর উপন্ডব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানি হলো শিল্পায়নের অবশ্যম্ভাবী সাতটি নিয়ামকের একটি। কিন্তু সীতাকুন্ড এলাকায় বর্তমানে পানি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। তাই এখন যদি লেক তৈরির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা যায় তাহলে শিল্পায়নে আরও গতি আসবে।’

শিল্পগ্রুপ পিএইচপি ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠান পিএইচপি শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম রিংকু বলেন, ‘সীতাকুন্ড এলাকায় পানির সমস্যা হওয়ায় আমরা ফেনীতে গিয়ে শিল্পকারখানা স্থাপন করছি। এখন যদি এই এলাকার পানি সমস্যা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসে তাহলে শিল্প উৎপাদন অনেক বেড়ে যাবে।’