তিতাসের সিস্টেম লস ও অবৈধ সংযোগ কমেছে

দেশের সর্ববৃহৎ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের অবৈধ সংযোগ এবং সিস্টেম লস কমেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বকেয়া গ্যাস বিল আদায়ের হার। কর্তৃপক্ষের নানামুখী উদ্যোগ আর কঠোর অবস্থানের কারণে গত দুই বছরে এই সাফল্য এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

তিতাস গ্যাস সূত্রমতে, অবৈধ গ্যাস ব্যবহার ও বকেয়ার কারণে ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবাসিক খাতে ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৪৮৬টি বার্নার (গ্যাসের চুলা), ৫১৫টি শিল্প, ৫২৯টি বাণিজ্যিক, ১৭৯টি ক্যাপটিভ (কারখানায় বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি বিদ্যুৎকেন্দ্র) ও ৫৪টি সিএনজি গ্রাহকের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে জরিমানা করা হয়েছে প্রায় ৪৭১ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৭৪৪ দশমিক ৪১ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদ করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই বছরে নানা অনিয়ম, অবৈধ কর্মকা-ে জড়িত থাকা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ৯ জনকে বরখাস্তসহ ৭৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি এবং ১ হাজার ২৮৩ জনকে বদলি করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে তিন বছর ধরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশীদ মোল্লাহ। সর্বশেষ গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে তৃতীয় মেয়াদে এক বছরের জন্য দায়িত্ব পান।

প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ মোল্লাহ বলেছেন, ‘তিতাস গ্যাসে এখন আর চিহ্নিত কোনো অবৈধ সংযোগ নেই। অবৈধ সংযোগের বিষয়ে আমরা অনেক অভিযান পরিচালনা করেছি। একটি অবৈধ সংযোগ থাকা পর্যন্ত আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা জনসংযোগ করেছি, বলেছি চুরি ঠেকাতে আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাদের বলেছি লাইন কেটে দেওয়ার পর আবার লাইন বসলে সেই অঞ্চলের লাইন বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতে আমরা অনেক ভালো ফল পেয়েছি।’

আগে তিতাসের গ্রাহকদের কাছে গ্যাস বিল বাবদ বকেয়ার পরিমাণ বেশি থাকলেও বর্তমানে তা অনেক কমে এসেছে। ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪৩ হাজার ৯২০ কোটি টাকা আদায় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বকেয়ার পরিমাণ ৮ হাজার ৮৭৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। মাসিক গড় বিলের পরিমাণ ৩ হাজার ৯৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা বকেয়ার সমতুল্য মাস ২ দশমিক ৮৭। বকেয়ার পরিমাণ আরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়নেও সাফল্য এসেছে পেট্রোবাংলার অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটির। ২০২১-২২ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার কোম্পানিগুলোর মধ্যে তিতাস গ্যাস প্রথম স্থান করে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের প্রচেষ্টার ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরেও তিতাস আগের অর্জিত সাফল্য ধরে রেখেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

গ্যাস দুর্ঘটনাজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ২২টি স্টেশনে বিশেষ ইউনিটের মাধ্যমে তিতাসের বিতরণ নেটওয়ার্কের গ্যাস গন্ধযুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরও ১৪টি স্টেশনে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অবৈধ গ্যাস সংযোগ, পুরাতন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনসহ নানা কারণে তিতাস গ্যাসের সিস্টেম লসের পরিমাণ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ১৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এটি কমতে কমতে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে আরও কমে এখন হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

গ্যাসের চুরি ও অপচয় ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের আঙিনায় গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছে। জাপান সরকারের ৩৫তম ওডিএ ঋণ প্যাকেজের আওতায় ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ইতিমধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন করা হয়েছে। এসব গ্রাহকের গ্যাস ব্যবহার বাবদ মাসিক ব্যয়ের পরিমাণও আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। আর এক লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজ চলমান, যা আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন।

এ ছাড়া একটি প্রকল্পের আওতায় তিতাসের নেটওয়ার্কে ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৯৫২টি রাইজার জরিপ করে গ্যাস লিকেজ (২০.৮৬ এমএমসিএফডি) বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকপর্যায়ে গ্যাসের চাপ বৃদ্ধি, নতুন পাইপলাইন স্থাপন, নেটওয়ার্কের আধুনিকায়নসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তিতাস গ্যাস।