জমি বন্ধক রেখে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখা থেকে ২৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে জালিয়াতি করে ব্যাংকের কাছে বন্ধক থাকা সেই জমিও ২০২২ সালে বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করা হয়। আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা ড. সূফি সাগর সামস।
তিনি বলেন, ‘গত জুন মাসে জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করা জমির দলিল বন্ধক রেখে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখা থেকে রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জনগণের ২৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অথচ রফিকুল ইসলাম ২০২২ সালের শেষ দিকে এসব জমি বিক্রি করে দেন। ঋণের টাকা কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা কিছুই জানে না ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ। ব্যাংক থেকে তিন দফায় এসব অর্থছাড় করা হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির টাকা কোথায় বিনিয়োগ হয়েছে, সেই তথ্য নিশ্চিত না হয়ে অনৈতিকভাবে ঋণের তৃতীয় কিস্তির অর্থছাড় করেছে ব্যাংক। একটি সংঘবদ্ধ চক্র অব্যাহতভাবে জনগণের রক্ষিত ব্যাংকের টাকা লুট করে যাচ্ছে। দেশবিরোধী এই অপকর্ম অনতিবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’
এ সময় রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ সম্পদ অর্জন, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দ্রুত অনুসন্ধান ও বিচারের দাবি জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ড. সূফি সাগর সামস আরও বলেন, ‘রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিক ও তার ছেলে মেহেদী হাসান দীপু, কাউসার আহমেদ অপু ও মালিহা হোসেন জোয়ার সাহারা, ভাটারা ও গুলশান মৌজার ৩৩৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখা থেকে ২৭০ কোটি ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে ভাটারা মৌজার ৪টি প্লটে রফিকুল ইসলামের বিক্রি করে দেওয়া ৯৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ জমিও রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘রফিকুল ইসলামের ভাটারা মৌজার ই-ব্লকের ৪৮২, ৪৮৩, ৪৮৪, ৪৮৭, ৪৮৮ ও ৪৮৯ প্লটের ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ, ৫০৭, ৫০৮, ৫১১ ও ৫১২ প্লটের ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ৫৩০, ৫৩১, ৫৩২, ৫৩৩, ৫৩৪ ও ৫৩৫ প্লটের ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ, ৫৫১, ৫৫২, ৫৫৬, ৫৫৭ ও ৫৫৮ প্লটের ২৭ দশমিক ৫১ শতাংশ জমি রয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এই জমি ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিল সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিলেও রফিকুল ইসলাম তা পরিশোধ করে দেন একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর। এসব জমির মধ্যে ৪৮২, ৪৮৩, ৪৮৪, ৪৮৭, ৪৮৮ ও ৪৮৯ প্লটের ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ ও ৫৩০, ৫৩১, ৫৩২, ৫৩৩, ৫৩৪ ও ৫৩৫ প্লটের ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ আবুল কাশেম গংদের কাছে বিক্রি করে দেন রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর ৫৫১, ৫৫২, ৫৫৬, ৫৫৭ ও ৫৫৮ প্লটের ২৭ দশমিক ৫১ শতাংশ জমি বিক্রি করেন ইমরান করিমের কাছে। ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তামান্না সুলতানার কাছে ৫০৭, ৫০৮, ৫১১ ও ৫১২ প্লটের ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ জমি বিক্রি করে দেন রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া আবুল কাশেম গংদের মালিকানাধীন ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং তামান্না সুলতানার নামে ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ জমির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি। এ ছাড়া আবুল কাশেম গংদের মালিকানাধীন ২২ দশমিক ৭০ শতাংশের আরেকটি প্লটের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে চলতি বছরের ১৯ মার্চ।
ড. সূফি সাগর সামস বলেন, ‘ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, বসুন্ধরা শাখা অবৈধভাবে ঋণ দেওয়া জমিতে বর্তমানে অন্য কোম্পানি ও মালিকের সাইনবোর্ড ঝুলছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে রফিকুল ইসলামের বন্ধক দেওয়া ৪টি প্লটের মালিকানার বিষয়ে গুলশান রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিশ্চিত করেছে বন্ধককৃত জমি বর্তমানে রফিকুল ইসলামের মালিকানায় নেই।’
তিনি বলেন, ‘তামান্না সুলতানার জমিতে ১৪ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ শুরু করেছে সুবাস্তু প্রপার্টিজ। এ ছাড়া ৪৮২, ৪৮৩, ৪৮৪, ৪৮৭, ৪৮৮ ও ৪৮৯ প্লটের ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ৫৩০, ৫৩১, ৫৩২, ৫৩৩, ৫৩৪ ও ৫৩৫ প্লটের ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ আবুল কাশেমের মালিকানাধীন ড্রিমওয়ে হোল্ডিংস লিমিটেড বহুতল ভবন নির্মাণের সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছে। আর ৫৫১, ৫৫২, ৫৫৬, ৫৫৭ ও ৫৫৮ প্লটের ২৭ দশমিক ৫১ শতাংশ জমি ইমরান করিম সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছেন।’
ড. সূফি সাগর সামস বলেন, ‘রংধনু গ্রুপের দখলে রয়েছে অসংখ্য জমি। মানুষের জমি দখল, ব্যাংকের টাকা লুটপাট, প্রতারণা, জালিয়াতি করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন একসময়ে বাড্ডার সামান্য ডিম বিক্রেতা রফিক। রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়া রফিকের অবৈধ সম্পদের অনেকাংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যথার্থভাবে তার সম্পদের হিসাব করলেই বের হয়ে আসবে প্রকৃত সত্য।’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রফিক বাহিনীর ত্রাসের রাজত্বে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা। জমি দখল করতে দিনে-দুপুরে প্রায়ই হামলা চালানো হয় স্থানীয় নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে। বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় মালামাল। রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবতী মেয়েদের তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অনেকে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ফেলে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও রংধনু গ্রুপের স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। রয়েছে একাধিক হত্যা মামলাও।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এই অনিয়ম, দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতি এক হাতে হয় না। একটি সংঘবদ্ধ চক্র আছে। তারা এসব করছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়, নিয়মিত ঘটছে। এসব অপকর্ম বন্ধ করতে হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদককে আরও কঠোর হতে হবে। বাস্তবিক অর্থে দুদককে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতে হবে। আমরা চাই রফিকুল ইসলামের সব দুর্নীতি উদঘাটন করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।