ঘড়ির কাঁটায় যখন ১২টা বেজে ৩১ মিনিট ঠিক তখনই হুইসেল বাজিয়ে ঝিকঝিক ঝিকঝিক শব্দে সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’। ১ হাজার ২০ জন যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন থেকে প্রথমবারের মতো লাল সবুজ রঙের এক ইঞ্জিন ও ২০ বগির ট্রেনটি রাজধানী ঢাকার পথ ধরে। এরই মধ্যে দিয়ে গতকাল শুক্রবার পর্যটন শহর কক্সবাজার যুক্ত হলো বাণিজ্যিকভাবে রেল নেটওয়ার্কে।
রেলওয়ে অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১১ নভেম্বর কক্সবাজার-দোহাজারী রেললাইন প্রকল্প উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর ১৯ দিন পর গতকাল থেকে এই পথে বাণিজ্যিকভাবে রেল চলাচল শুরু হয়েছে। তবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা-কক্সবাজার কোনো টিকিট নেই। আরও এক সপ্তাহ আগেই এসব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে এ পথের রেলে দুটি বগি বাড়ানো হয়েছে। তবুও টিকিট পাচ্ছে না পর্যটক ও স্থানীয় লোকজন। আপাতত কক্সবাজার-ঢাকা পথে একটি ট্রেনই চলবে। এটি সকালে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে যাবে। আর রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসবে। এই কক্সবাজার এক্সপ্রেসের দুটি বগির ১১৫টি আসন চট্টগ্রামের যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে।
গতকাল সকালে সমুদ্রসৈকত থেকে ৫ কিলোমিটার দূরের ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়ায় নবনির্মিত আইকনিক রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশমুখে এখনো কোনো গেট, সাইনবোর্ড কিংবা নামফলক লাগানো হয় না। তবে নিরাপত্তাকর্মীরা বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছেন। সর্বসাধারণদের জন্য এখনো স্টেশনটি উন্মুক্ত করা হয়নি। শুধু যাত্রীরাই ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন। ব্যারিকেড পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মেলে পার্কিং এরিয়া ও স্টেশন ভবনের মূল প্রবেশদ্বারে কাজ করছে নির্মাণশ্রমিকরা। মূল প্রবেশদ্বারের ডান পাশেই ভিআইপি টিকিট কাউন্টার। সেটি খোলা রাখা হয়েছে টিকিট বিক্রির জন্য। এই অংশ দিয়েই যাত্রীরা একে একে ঢুকছেন মূল ভবনে। এখানেও নির্মাণকাজ চলমান। এ ছাড়া ভবনের পেছনে চলছে নির্মাণকাজের বড় অংশ। সেখানেও রয়েছে নিরাপত্তাকর্মীদের অবস্থান। ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের বেশিরভাগ অংশের নির্মাণকাজ শেষ হলেও ২ ও ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মের কাজ চলমান আছে। ভবনের পেছনের অংশে রঙ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ওভারব্রিজের নির্মাণকাজও বাকি রয়েছে। চালু হয়নি লিফট সেবাও। পুরো প্ল্যাটফর্মের নানান জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এখনো রেলের পাটাতন বসানোর কাজ চলছে। তবে অল্পস্বল্প কাজ বাকি থাকলেও তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই যাত্রীদের। প্রথমবারের মতো ট্রেনে চড়ে ইতিহাসে নাম লেখানোর আনন্দে বিভোর তারা।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বেলা ১১টায় খুলে দেওয়া হয় ট্রেনের বগি। এ সময় টিকিট চেক করে যাত্রীদের ফুল ও চকলেট দিয়ে বরণ করা হয়। সুপারভাইজাররা যাত্রীদের আসনে বসিয়ে দেন। প্রথম যাত্রীবাহী ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনের চালক লোকোমাস্টার আবদুল আউয়াল রানা ও সহকারী লোকোমাস্টার রাকিবুল হাসান রাজু।
লোকোমাস্টার আবদুল আউয়াল রানা বলেন, ‘ইতিহাসের প্রথম কক্সবাজার থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে ট্রেন। এটি চালানোর একটি ইতিহাসের সাক্ষী হলাম, ভালো লাগছে।’
কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাওয়া সাতকানিয়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আবু বক্কর বলেন, ‘১৯৮০ সাল থেকে স্বপ্ন দেখছিলাম ট্রেন আসবে কক্সবাজার। অবশেষে সেই স্বপ্নপূরণ হলো।’
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার আতিকুর রহমান বলেন, ‘দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে কক্সবাজার বাণিজ্যিকভাবে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেসের গতিসীমা ১২০ কিলোমিটার। এটি বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে যাত্রাপথে চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছেছে। ঢাকায় রাত ৯টার দিকে পৌঁছানোর কথা।’
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার ফরহাদ বিন চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৯৫ টাকা। এসি চেয়ারের ভাড়া ১ হাজার ৩২৫, এসি সিটের ভাড়া ১ হাজার ৫৯০ ও এসি বার্থের ভাড়া (ঘুমিয়ে যাওয়ার আসন) ২ হাজার ৩৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া ২০৫, স্নিগ্ধা শ্রেণির ৩৮৬, এসি সিটের ৪৬৬ ও এসি বার্থের ভাড়া ৬৯৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ট্রেনের দুটি বগি চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী ও কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ম্যাক্স গ্রুপের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মুহাম্মদ ইয়াকুব বলেন, ‘একটি টিকিট কাউন্টার ও পার্কিং এবং প্ল্যাটফর্মের অল্প জায়গা ছাড়া অন্যসব এলাকায় জনসাধারণকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। নির্মাণকাজ চলমান থাকায় ঝুঁকি এড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ হতে আরও ছয় মাসের মতো লাগতে পারে।’
গতকাল যাত্রীবাহী প্রথম ট্রেনের যাত্রাকালে আইকনিক স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। তিনি প্রথম ট্রেনের যাত্রীদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
বাণিজ্যিকভাবে রেল চালু হওয়ায় কক্সবাজারে আগের তুলনায় দুই-তিনগুণ পর্যটক বাড়বে বলে মনে করছে সচেতনমহল। সমৃদ্ধ হবে পর্যটনশিল্প। পর্যটকদের নিরাপত্তায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের প্রধান অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আপেল মাহমুদ বলেন, ‘কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপদে আসা-যাওয়া নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের একাধিক টিম কাজ করবে। টহল টিমের পাশাপাশি থাকবে স্পেশাল ফোর্স। এ ছাড়া পর্যটকদের সুবিধার্থে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম, জরুরি সেবা ও হটলাইন।’