এরিকা রবিন মিস ইউনিভার্স পাকিস্তান ২০২৩ জিতেছেন। ৮০ দেশের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি শীর্ষ ২০ জনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। তাকে নিয়ে যতটা না আলোচনা তার চেয়ে বরং আলোচনায় এসেছে সুইমস্যুট ইভেন্টে সুইমস্যুট না পরে বুরকিনি পরে হাজির হওয়াকে নিয়ে। বুরকিনিও নতুন পোশাক নয়। ১৮ বছর আগেই তৈরি হয়েছিল এই পোশাক। লিখেছেন সুইম বাংলাদেশের প্রধান সাঁতার প্রশিক্ষক সৈয়দ আখতারুজ্জামান
একজন এরিকা রবিন
এরিকা রবিন পাকিস্তানের ২৫ বছর বয়সী তরুণী। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর করাচিতে তার জন্ম। পেশায় ফ্যাশন মডেল এবং পাকিস্তানের সংখ্যালঘু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। এ বছর মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত মিস ইউনিভার্স পাকিস্তান ২০২৩ জয় করেন তিনি এবং মিস ইউনিভার্সের বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করেন। ১৮ নভেম্বর ২০২৩ এল সালভাদরে আয়োজিত মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় এই প্রথম কোনো পাকিস্তানি অংশগ্রহণকারী হিসেবে শীর্য ২০-এ স্থান করে নেন। কিন্তু তিনি আলোচনায় উঠে আসেন অন্য কারণে।
মুসলমান না হয়েও পাকিস্তানের প্রতি দেশপ্রেম, শ্রদ্ধাবোধ এবং পাকিস্তানের সংস্কৃতিকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস প্রশংসিত হয়। বিশেষ করে মুসলিম বিশে^ তার উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ফ্যাশন মডেলের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে উপজীব্য করে এমন ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব উপস্থান করা যেতে পারে তা বিরল ঘটনা বটে। তিনি কেন বিদেশে পাড়ি জমানোর এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানে থাকতে পছন্দ করছেন এই প্রশ্নের উত্তরে জানান, যদিও অন্য সব দেশের মতোই পাকিস্তানেরও নানা রকম সমস্যা আছে, কিন্তু সব কিছুর শেষে পাকিস্তান তার মাতৃভূমি, পাকিস্তান তার দেশ। এ দেশের সংস্কৃতির প্রতি তার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা শতভাগ। এবং মাতৃভূমির এই সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরাই তার উদ্দেশ্য। এই জবাবের পর আর কোনো প্রশ্ন চলে না।
বুরকিনি কেন প্রয়োজন?
সারা বিশ্বের মুসলিম নারী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে পর্দা প্রথা মেনে আরামদায়ক আধুনিক নতুন পোশাক পরিকল্পনার চাহিদা দীর্ঘ দিনের। আর সেই ক্রীড়াবিদদের মধ্যে যারা সাঁতারু তাদের মধ্যে প্রাসঙ্গিক কারণেই চাহিদা আরও বেশি । উপরন্তু সাঁতার এমন একটি মাধ্যম, যা শুধু ক্রীড়া হিসেবে নয়, সুস্থ থাকার জন্য বা শরীর চর্চার মাধ্যম হিসেবেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে চাহিদার ব্যাপ্তি আরও বেশি। কেবল এই পোশাক সমস্যা এবং পর্দা সমস্যার কারণে সুইমিংপুলে মেয়েদের সাঁতার কাটার অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায় না। এমনকি পরিবারের পক্ষ থেকেও বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। এই সমস্যার আধুনিক আরামদায়ক এক সমাধানের নাম বুরকিনি, পর্দা সচেতন নারী সাঁতারুদের এ যাবতকালের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সাঁতার-পোশাক।
বুরকিনি ব্যবহারে সুবিধা
সবচেয়ে বড় সুবিধা পর্দা মেনে বানানো হয়েছে বুরকিনি। দুনিয়ার সর্বত্রই পেশাদার সাঁতারুর চেয়ে সাধারণ সাঁতারুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে যতটা না পেশাদার সাঁতারুদের জন্য তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কোটি কোটি মুসলিম নারীদের দৈনন্দিন সাঁতার চর্চার জন্য এই পোশাক আশার আলো বয়ে এনেছে।
বুরকিনি দুই পিস এবং চার পিসের সমন্বয়ে হতে পারে। তবে দুই পিসই সবচেয়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয় ট্রাউজার এবং টপস। টপসের সঙ্গে হিজাব অংশ জুড়ে দেওয়ার ফলে সুইম ক্যাপের উদ্দেশ্যও পূরণ হয়ে যাচ্ছে। হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল আর মুখমন্ডল ছাড়া শরীরের পুরো অংশই ঢাকা থাকে এই পোশাকে। আর এই পোশাকের জন্য এমন হালকা কাপড় নির্বাচন করা হয়, যা সাঁতারের জন্য উপযোগী। সাঁতার কাটতে কোনো প্রকার বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় না। এ ছাড়া সাঁতার পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকই আছেন যাদের অধিকাংশ সময় সাঁতার কাটতে হয় না, কিন্তু সাঁতার কাটার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় যেমন লাইফ গার্ড, প্রশিক্ষক, সহকারী ইত্যাদি। প্রত্যেক সুইমিংপুলে, প্রত্যেক পর্যটকমুখর সৈকতে বা প্রত্যেক জলক্রীড়ার স্থানে লাইফ গার্ড সদাপ্রস্তুত থাকার প্রয়োজনীয়তা আছে। তাদের জন্য এই পোশাক অত্যন্ত উপযোগী।
বুরকিনি ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা
যারা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেশাদার সাঁতারু এবং প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে অংশগ্রহণ করেন তাদের সাঁতার প্রতিযোগিতার ইভেন্ট হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম মেনে চলতে হয়। সেখানে পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বুরকিনি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মুক্তজলাশয়ের দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারে পুরো শরীর ঢাকা সুইমস্যুট ব্যবহার করার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ধরনের সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সময় বুরকিনি ব্যবহার করা নাও যেতে পারে। তবে দিনে দিনে অনেক নিয়মনীতির পরিবর্তন হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম নারী সাঁতারুরা এই পোশাকে আন্তর্জাতিক মানের সাঁতার প্রতিযোগিতাতে অংশ নিতে পারবেন কিনা সেটা এখনই বলা মুশকিল।
আরেকটি প্রতিবন্ধকতার নাম পানির সংঘর্ষ। পানির মধ্যে যে কোনো পোশাকই সাঁতারের গতিকে অতি সামান্য হলেও কমিয়ে দেয়। আর অলিম্পিকের মতো সাঁতার প্রতিযোগিতায় মিলি সেকেন্ডের ব্যবধানেই জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়ে যায়। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সাঁতারুরা নিয়ম মেনে যতটা কম পোশাক রাখা যায় ততটাই স্বল্পবসনা হয়ে থাকেন। এমন প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনে বুরকিনি কি অন্তরায় হতে পারে। তবে শেষ কথা হচ্ছে, বুরকিনি যতটা না সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি বৃহত্তর মুসলিম নারী সমাজের দৈনন্দিন সাঁতারের জন্য। আর জলক্রীড়ার অনেক অঙ্গন আছে যেখানে পুরো শরীর ঢাকাতে কোনোই সমস্যা নেই। যেমন সার্ফিং, ডাইভিং, স্নোর কেলিং ইত্যাদি।
বুরকিনি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ও কিছু কথা
এরিকা রবিন বুরকিনি পরার ফলে সর্বত্র প্রশংসা কুড়িয়েছেন এমনটি পুরোপুরি সত্যি নয়, কেউ কেউ বেশ কড়া সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু তাতে তিনি মোটেও দমে যাননি, বরং গর্বের সঙ্গে বলেছেন, তিনি যা বিশ্বাস করেন তারই নিঃসংকোচ বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার মঞ্চে। শুধু সমালোচনাই নয়, ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে ফ্রান্সের নিস শহরে বুরকিনি ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করা হয়েছিল। এই সময়ে সৈকতে বুরকিনি পরা এক রমণীকে বুরকিনি খুলে ফেলতে বাধ্য করছে ফ্রান্সের পুলিশ বাহিনীর কয়েকজন সসদ্য। এমনি একটি ছবি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে পুরো মুসলিম বিশে^ আবারও ঝড় ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই আচরণের সমালোচনা করে। এর কিছু দিনের মধ্যে আদালত এই নিষেধাজ্ঞা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। ফলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। কিন্তু পশ্চিমের দেশগুলোতে বুরকিনির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন থেকেই গেছে।
দাম কেমন ও কোথায় পাওয়া যাবে
বুরকিনির মান ও ডিজাইন হিসেবে দাম নানা রকম। আহিদা ডকটম ওয়েবসাইটে বুরকিনির দাম ১৪০ থেকে শুরু করে ২৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত দেখা গেছে। যা বর্তমান বাজার মূল্যে বাংলাদেশি টাকায় ১০ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে। কিন্তু বাংলাদেশে দু-একটি অনলাইন শপে নানা মানের বুরকিনির মূল্য ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।