শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার, আত্মমর্যাদা রক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মান উন্নয়নে সরকার ও নিজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে ‘দর-কষাকষির পর্ষদ’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শিক্ষক সমিতি সময়ের পরিক্রমায় হারাচ্ছে তার স্বকীয়তা ও ঐতিহ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকদের স্বার্থের চেয়ে ‘রাজনৈতিক কর্মসূচিতে’ বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সংগঠনটি। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সে দলের হয়ে কাজ করে। ফলে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা সাধারণ শিক্ষকরা এখন আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না সংগঠনটিতে। তারা বলছেন, ঢাবি শিক্ষক সমিতি এখনো ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে একচেটিয়াভাবে নীল দলের আধিপত্য রয়েছে। শিক্ষকদের স্বার্থের চেয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে দলীয় স্বার্থ। এটি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ নিয়েছে। সমিতির গত এক বছরের কার্যক্রম বিশ্লেষণে তাদের বিবৃতি কিংবা কর্মসূচি বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এ সময় তারা প্রথম আলোর সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে, বিএনপির হরতাল-অবরোধের প্রতিবাদ জানিয়েছে, ডা. ইউনূসের শাস্তি দাবি করেছে, শেখ হাসিনাকে হত্যার প্রতিবাদ ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আচরণের প্রতিবাদসহ এমন বেশ কয়েকটি কর্মসূচি তারা পালন করেছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, তাদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তন করা, চাকরির বয়সসীমা ৬৭ বছর করার দাবি, অবসর গ্রহণের ক্ষেত্রে সেশন বেনিফিট সুবিধা বাতিল হওয়া, ইউজিসি কর্তৃক বাতিল হওয়া গবেষণা ভাতা বহাল রাখাসহ শিক্ষকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বর্তমান শিক্ষক সমিতি। সম্মানজনক পদ প্রফেসর ইমিরেটাসের ক্ষেত্রেও বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যা উন্নত দেশগুলোতে আমৃত্যু রয়েছে। এ নিয়ে এখনো পর্যন্ত কথা বলতে দেখা যায়নি কাউকে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ স্ট্যাটাসের দাবিও আলোর মুখ দেখেনি।
সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছরে শিক্ষক সমিতি শিক্ষকদের কল্যাণে, পেশাগত সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার্থে, ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ সমুন্নত রাখতে সমিতি সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেনি। কিন্তু কোনো বিষয় সরকারের বিপক্ষে গেলেই ইমিডিয়েটলি তারা বিবৃতি, মানববন্ধনের ডাক দিচ্ছে। এ জায়গাটাকে তারা দলীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে, সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে।
তিনি বলেন, শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রেও দলীয় পরিচয় প্রাধান্য পাচ্ছে। সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভিন্নমতের শিক্ষকদের যথাসময়ে পদোন্নতিসহ বিভিন্ন পেশাগত সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এদিকে কয়েক বছর ধরেই শিক্ষক সমিতিতে আওয়ামী লীগ সমর্থক প্যানেল জয়ী হয়ে আসছে। গত বছরের নির্বাচনে ১৫টি পদের ১৪টিতেই জয় পেয়েছিলেন নীল প্যানেলের প্রার্থীরা। বিএনপিপন্থি সাদা দলের প্রার্থীরা সর্বোচ্চ একটি কিংবা দুটি পদে জয়ী হতে পারছেন। তবে শিক্ষক সমিতিকে সরকারের আজ্ঞাবহ উল্লেখ করে সর্বশেষ নির্বাচন বর্জন করেছে সাদা দল। ২০১৬ সালের পর আর অংশ নেয়নি বামপন্থিরা।
শিক্ষকরা বলছেন, যারা প্রশাসনে যুক্ত তারাই আবার শিক্ষক সমিতিতে নির্বাচিত হচ্ছেন। যার ফলে শিক্ষকদের পক্ষে দর-কষাকষির বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। এর প্রমাণ মেলে বর্তমান শিক্ষক সমিতির দিকে তাকালেও। প্রভোস্ট, ডিনসহ নানাভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অনেকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজীম উদ্দিন খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে থাকেন তারাই শিক্ষক সমিতিতেও থাকেন। তারা কীভাবে শিক্ষক সমিতির ভূমিকা পালন করবেন। শিক্ষক সমিতি হলো ছাত্র-শিক্ষকের পক্ষে দর-কষাকষির জায়গা। এখন আমি যদি প্রশাসনের অংশ হই আবার সমিতির নেতৃত্বেও আসি, তাহলে সমিতি অকার্যকর হবে এটাই স্বাভাবিক। এটা একটা দলীয় ও ওপরে ওঠার সমিতি ছাড়া আর কিছু নয়।’
তিনি বলেন, নীল দলে কারা মনোনয়ন পাবে সেটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই ঠিক করে দেয়। প্রশাসনের নির্দেশনার বাইরে দলের কিছু করার সুযোগ নেই। আগে এমনটা ছিল না। শিক্ষকদের পেশাগত স্বার্থ বিবেচনায় ভালো নেতৃত্ব নিয়ে আসার চেষ্টা ছিল, এখন পেশাগত স্বার্থটা গুরুত্ব পায় না। মনোনয়ন পাওয়া পর্যন্তই আমেজ, নির্বাচিত হতে এখন আর কষ্ট করতে হয় না। সারা বছর শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা তাদের পক্ষে কথা বলতেও হয় না। সেজন্য সমিতির নির্বাচনের জৌলুসটা নেই।
ঢাবিতে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত প্রায় দুই যুগ ধরে দেশের সরকারে যখন যে দল থাকে, তখন তাদের সমর্থক বা তাদের পরিচয়ের সূত্রে বেশিরভাগ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলটির সমর্থকদের প্রভাব কমতে শুরু করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত কিছুটা প্রভাব থাকলেও বর্তমানে তা শূন্যের ঘরে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের প্রভাব অনেকটাই নিরঙ্কুশ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রভাষক শ্রেণিতে কাউকে মনোনয়ন দিতে পারেনি সাদা দল।
সাদা দল নেতারা বলছেন, গত ১২-১৩ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সময় কোনো প্রার্থীর বিরোধীদলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক বা সমর্থনের বিষয়টি জানা গেলে তাকে আর শিক্ষক/প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। প্রভাষক পদে প্রার্থিতা করে এগিয়ে থাকলেও অনেককে নিয়োগ দেওয়া হয়নি শুধু বিরোধীদলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লেষ থাকার কারণে।
সাদা দলের আহ্বায়ক ও সমিতির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘গত ১৪-১৫ বছর ধরে নীল দল ক্ষমতায় থাকার কারণে নতুন যে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে তাদের ওপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। একদিকে আগের শিক্ষকরা যেমন অবসর নিয়ে আমাদের ভোট কমছে, অন্যদিকে নতুন নিয়োগে তাদের ভোট বাড়ছে। নতুন ভোটারদের ওপর তারা অনেক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ফলে তারা বেশিসংখ্যক আসনে জয়ী হয় এবং আমরা দেখা যায় দুয়েকটি আসন পাই।’
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সর্বশেষ ২০০৭ সালে তার ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশকে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সে সময় দলমত নির্বিশেষে ভূমিকা রেখেছিল শিক্ষক সমিতি। আমাদের চারজন শিক্ষককে কারাগারে যেতে হয়েছে, দণ্ড ভোগ করতে হয়েছে। আমরা সে ধরনের একটা শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখতে চাই।’
অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য এবং একাধিকবার সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষক সমিতি শিক্ষকদের সংগঠন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি দেশের স্বার্থে অগণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করত। ঐতিহ্যগতভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির গুরুত্ববহ ভূমিকা সবসময় ছিল।’
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, ‘সাদা দল যেসব অভিযোগ তুলেছে সেগুলো চরম মিথ্যাচার। করোনায় আমরা ভ্যাকসিন কার্যক্রম করেছি, সব রঙের শিক্ষক এর সুযোগ নিয়েছে। শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে আমরা উপাচার্যের সঙ্গে বসেছি, দিনরাত কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পেশাল স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। জাতীয়, আন্তর্জাতিক বিষয়েও আমরা কথা বলেছি। সাদা দল নির্বাচন বর্জন করে দুই হাজার শিক্ষকের রায়কে অশ্রদ্ধা করেছে, যেটা সত্যিই দুঃখজনক।’
সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘ফলাফলের ভিত্তিতেই শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে, এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বিএনপি লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে এবং জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তালগোল পাকিয়ে তারা নির্বাচন বর্জন করেছে। প্রতিটি নিয়োগ এবং প্রমোশন কোনোটাই দলীয় বিবেচনায় হয় না। দলীয় বিবেচনায় হলে সাদা দলের কেউ প্রমোশন পেত না। তাদের যেসব অভিযোগ সেগুলো মনগড়া, আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা শিক্ষকদের স্বার্থে কথা বলি, পাশাপাশি জাতির ক্রান্তিলগ্নে অনেক কিছুতেই আমাদের কথা বলতে হয়। শিক্ষক সমিতি যেটা সঠিক মনে করেছে, সে কাজটাই করেছে।’