নানা আলোচনা-সমালোচনা ও নাটকীয়তার পর আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। ভোটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে না পারলেও এবার আরও বেশি আসনে জিতে সত্যিকারের বিরোধী দল হতে চায় সর্বশেষ দুই সংসদে কথিত বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা দলটি। এজন্যই এবার তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। বড় জয় নিশ্চিত করতে নৌকার বিরোধিতা ও তরুণ ভোটারদের দিকে নজর দিচ্ছে দলটি। নৌকাবিরোধী প্রচার ও তরুণবান্ধব ইশতেহারের দেওয়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া দলটি।
জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, চলতি সপ্তাহেই জাপা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে। এবারের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করতে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছে তাদের একটি টিম। জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, যা নিয়মিত তদারকি করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতেহার মূল্যায়ন থেকে শুরু করে নিজেদের ও আওয়ামী লীগের বিগত সময়ের ইশতেহারের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণদের জন্য বিশেষ চমক রয়েছে বলে জানায় এই সূত্র।
সূত্রটি দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, বেকার সমস্যা নিরসন ও চাকরিপ্রত্যাশীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কিছু যুগান্তকারী কর্মপরিকল্পনা রয়েছে এবারের ইশতেহারে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের দেশের শাসন পরিচালনার একটা নিজস্ব দর্শন রয়েছে, যা থাকবে এবারের ইশতেহারে। জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় গেলে দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে নিয়ে আসা, ব্যাংক খাতের লুটপাট বন্ধ, স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঢাকার পরিবর্তে বিভাগীয় শহর, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারকে অধিক ক্ষমতা দেওয়া, প্রতিটি উপজেলায় একটি করে হাসপাতাল নির্মাণ, ডিজিটাল ও সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনসহ অনেক প্রস্তাবনা ও রূপরেখাও থাকছে এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে।
দলটির একাধিক নেতা বলেছেন, জাতীয় পার্টি এবার সত্যিকারের বিরোধী দল হওয়ার বাসনা নিয়ে ২৮৭ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। জাতীয় পার্টি এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে পুরো দেশে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সক্রিয় করতে চায়, যা শুধু আসন্ন নির্বাচন নয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। এবার জাতীয় পার্টি উল্লেখযোগ্য আসন নিয়ে সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসতে চায়। বিএনপি নির্বাচনে না আসাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে চায়। বিএনপি নির্বাচনে না আসায় তাদের বড় নেতারা ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন না। এ ক্ষেত্রে জাপা চায়, স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা, যাতে তাদের সমর্থক ও কম সক্রিয় নেতারা জাপার ব্যালটে ভোট দেন।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আসনে বিজয়ী হয়ে জাপা বিরোধী দলের আসনে বসবে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে নিজস্ব ভোটব্যাংকের পাশাপাশি আওয়ামী ও সরকারবিরোধী এবং তরুণ ভোটারদের ভোট জাপার বাক্সে নিয়ে আসা। আওয়ামী লীগের ভোট আমরা পাব না, কিন্তু দেশের তরুণদের একটা অংশ আছে যারা আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলকে অপছন্দ করে, তারা চায় জাপা নিজের পায়ে দাঁড়াক এবং রাজনীতিতে বড় শক্তি হয়ে উঠুক। সুষ্ঠু ভোট হলে এই তরুণরা ভোটকেন্দ্রে যাবে এবং জাপার বাক্সে ভোট দেবে।’
এ দেশের মানুষ নির্বাচনমুখী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি আসনে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটাররাও কিন্তু ভোট দিতে যাবেন। এ ক্ষেত্রে তারা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না, ফলে এই ভোট জাপা পাবে। এ নিয়ে আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি, যা ইশতেহারে থাকবে এবং আরও কিছু বিষয় আছে যা প্রার্থীদের সঙ্গে মিটিং করে বুঝিয়ে দিয়েছি।’
জাপা মহাসচিব বলেন, ‘এবার কারও সঙ্গে আলোচনা, দর-কষাকষিতে আমরা নেই। এখন একটি জিনিসই চাই, নির্বাচন ভালো পরিবেশে, সুষ্ঠু পরিবেশে হবে। আমরা আশ্বাস পেয়েছি নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে। আশ্বাস দেওয়া হয়েছে পরিবেশ হবে; পরিবেশ হওয়ার জন্যই অপেক্ষায় আছি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব, যদি মনে হয় পরিবেশ হয়নি, ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন না, তাহলে আমরা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হব না।’
এদিকে জাপার একাধিক সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সমর্থন ছাড়া ভোটের মাঠে জাপা প্রার্থীরা ভালো কিছু করতে পারবেন না। সরকার ভোটের আগে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নির্দিষ্ট আসনে ছাড় দেওয়ার, যা এখনো স্পষ্ট হচ্ছে না। আমাদের দলের পক্ষ থেকে ৫০ আসনে ছাড় দেওয়ার দাবির বিষয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ৩০-৩৫ আসনের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। আসন সমঝোতা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিলে বর্তমান সংসদে তো ২৩টি আসন আছে, আগামী সংসদে ১০টিও থাকবে কি না সন্দেহ আছে। ইতিমধ্যে আমরা জানিয়ে দিয়েছি সমঝোতা ছাড়া নির্বাচন থেকেই সরে দাঁড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’
এদিকে নির্বাচন ও আসন সমঝোতার প্রশ্নে জাপায় এই দুই ধরনের অবস্থান ভাবাচ্ছে দলটির সিনিয়র নেতাদের। এ নিয়ে দলীয় প্রধান জিএম কাদের ও মহাসচিবকে চাপ দিচ্ছেন তারা।
চলতি বছর অনুষ্ঠিত ৫টি সিটি নির্বাচনে জাপার ফলাফলকে উদাহরণ হিসেবে টেনে তারা বলছেন, পাঁচ সিটির নির্বাচনেও বিএনপি ছিল না। কিন্তু সিলেট বাদে কোথাও তৃতীয় হতে পারেনি জাপা। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগ, স্থানীয় প্রশাসন মিলিয়ে তিনপক্ষের সঙ্গে লড়াই করার মতো অবস্থান জাপায় নেই।
অন্যদিকে সংসদে নেই এমন নেতাদের মতে, সময় হয়েছে আওয়ামী লীগের খোলস থেকে বেরিয়ে আসার। এভাবে আওয়ামী লীগের ছায়ায় থাকলে জাপা বিলীন হয়ে যাবে। জাপাকে পেছনে ফেলে ইসলামী আন্দোলনের মতো দল ভোটের মাঠে ভালো ফলাফল করছে শুধু তাদের স্বতন্ত্র অবস্থানের কারণে। বিপরীতে জাপা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে দিনে দিনে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।
জাপার কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসন নিয়ে জাপার সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠক করে দু-এক দিনের মধ্যে জাপার সঙ্গেও বৈঠক হতে পারে। সমঝোতা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিলে জাপার বর্তমান আসন ধরে রাখার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
জাপার আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা মাসরুর মাওলা বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নিলে হার-জিত থাকবেই এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই আগাতে হবে। আমরা একক দল হিসেবে নির্বাচন করছি। জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের জাপার হারানো শক্তি পুনরুদ্ধার করতে চান। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ও সরকারবিরোধী ভোটের সঙ্গে জাপার নিজস্ব ভোট মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য আসন পাওয়া সম্ভব। ফলে এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা নিয়ে ভাবছি না।’