অপহরণের পর জিডি, ৩ দিন পর মিলল শিশুর লাশ

অপহরণের তিন দিন পর লাশ মিলল রাজধানীর পার্শ্ববর্তী রূপগঞ্জের ৯ বছরের শিশু ওসমান গণি স্বাধীনের। খিলগাঁও এলাকার নৌ-পুলিশের সদস্যরা খবর পেয়ে গত সোমবার সন্ধ্যায় বালু নদী থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। সংশ্লিষ্টরা বলছে, রূপগঞ্জে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে একটি মহল ওই শিশুকে হত্যা করে থাকতে পারে। সুষ্ঠু তদন্ত করলে আসল ঘটনা জানা যাবে।

নিহতের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, মেলায় যাওয়ার কথা বলে তিন দিন আগে ঘর থেকে বের হয়েছিল স্বাধীন। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় গত শনিবার রূপগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা শাহিনুর রহমান। এদিকে একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে কয়েক দফায় টাকা চাওয়া হয়েছিল। তবে পুলিশকে সেই ঘটনা জানানোর পর থেকে ফোন নম্বরটি বন্ধ হয়ে যায়।

গতকাল বিকেলে সরেজমিন নাওড়াপাড়ায় গেলে দেখা যায়, শাহিনুর রহমানের বাড়ির সামনে অসংখ্য মানুষের ভিড়। তার দুই ছেলের মধ্যে বড় ছিল স্বাধীন। এমন ফুটফুটে শিশুর মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকে বলেছেন, কিছুদিন আগে মোজাম্মেল, রুবেল ও বিল্লাল শিশুর বাবা শাহিনুরের কাছে চাঁদা দাবি করেছিল। তবে তিনি চাঁদা দিতে কালক্ষেপণ করেছিলেন। এর মধ্যেই স্বাধীনকে অপহরণ করা হয়।

নিহত শিশুর ফুপা আবদুর রহিম বলেন, গত ১ ডিসেম্বর বিকেলে তাদের পাশের এলাকায় বসুলিয়ায় মেলা দেখতে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে আর বাসায় ফেরেনি। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে কোথাও না পেয়ে পরদিন (২ ডিসেম্বর) রূপগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে রাসেল নামে ভ্যানচালক পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি স্বাধীনের বাবাকে ফোন করে জানান, তাদের কোনো শিশু হারিয়েছে কি না। তিনি তাকে দেখেছেন নতুন বাজার এলাকায়, এই বলে ৮০০ টাকা বিকাশে পাঠাতে বলেন এবং টিটিপাড়ায় যেতে বলেন। আমরা সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করি। তখন তিনি বলেন, আমি এখন সদরঘাটে চলে আসছি। আপনারা দেখেন আসাদ নামে একজনের কাছে শিশুটি আছে। আমরা সেই এলাকায় অনেক খোঁজাখুঁজি করি, পাইনি। পরে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করি কিন্তু ফোন বন্ধ পাই। পরে আরেকবার ফোন করে জানান, আপনারা ৮০০ টাকা দিতে পারেন না। আবার সন্তানের খোঁজ নেন!

স্বাধীনের বাবা শাহিনুর বলেন, ‘আমার পোলা তো কোনো দোষ করে নাই। নিষ্পাপ শিশুটিকে ওরা মেরে ফেলল! থানায় না। আমি ঢাকার ডিবির কাছে অভিযোগ দিব। তারা যেন খুনিকে শাস্তি দেয়।’

জানা গেছে, নিহত স্বাধীনের বাবা শাহিনুরের দোকান নাওড়া পশ্চিমপাড়ায়। তার দোকানের সীমানা ঘেঁষা একজন প্রভাবশালীর অফিস। তার কথায় আইন সেই গ্রামে। প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে তিনি নিয়মিত আড্ডা দেন ওই অফিসে।

গতকাল সন্ধ্যায় এ বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় তিনবারের সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এ গ্রামে রীতিমতো রাজতন্ত্র চলছে। একটি মহলের কথায় এখানে সবকিছু। আমার মতো কিছু লোক প্রতিবাদ করার কারণে ওই মহলের জিঘাংসার শিকার হয়েছি বিভিন্ন সময়।’

তিনি বলেন, ‘রুবেল, মোজাম্মেল ও বিল্লাল এলাকায় রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে দীর্ঘদিন ধরে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করে না। তাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে খোদ সরকারদলীয় সমর্থক অন্তত ২০০ পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। আবার তারা চাচ্ছে এলাকা অস্থির করতে। তাহলেই তাদের লাভ।’

গত সোমবার সন্ধ্যায় বালু নদীতে এক শিশুর (ডি-কম্পোজ) মরদেহ ভেসে থাকতে দেখে স্থানীয়রা খবর দেয় নৌ-পুলিশকে। পরে নৌ-পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থল গিয়ে শিশুটির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢামেক হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন খিলগাঁওয়ের রাজাখালী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুজ্জামান। এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জোবায়ের হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল ডিএমপি এলাকায়। তাই এ বিষয়ে আমরা এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।