রাজশাহীর মোহনপুরে বর্তমান সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আয়েন উদ্দিনের লোকজনের মারধরে আওয়ামী লীগের তিন কর্মী আহত হয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় এ হামলা চালানো হয়েছে বলে আহতরা দাবি করেছেন। এদিকে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে মমতাজ সমর্থক প্রকাশ্যে হত্যা ও পুলিশ প্রশাসন দিয়ে হয়রানির হুমকি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থককে। অন্যদিকে গত ২ ডিসেম্বর পঞ্চগড় সদর উপজেলার আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন করলে সেসব সমর্থককে হাড়হাড্ডি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে গতকাল বুধবার প্রার্থী জবাব দাখিল করেছেন।
রাজশাহী-৩ আসনের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আয়েন উদ্দিনের লোকজনের মারধরে আহতরা হলেন একই গ্রামের মাহবুব আলম, এরশাদ আলী ও তার ছেলে মুরাদুল ইসলাম। তারা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তারা সবাই রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে আওয়ামী লীগকর্মী। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহা. আসাদুজ্জামান আসাদের পক্ষে তারা কাজ করেন।
এ ব্যাপারে মোহনপুর থানার ওসি হরিদাস পাল বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলায় তিনজন আহতের ঘটনা শুনেছি। তারা হাসপাতালে ভর্তি আছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নৌকাবিরোধীদের হাড় ভাঙার হুমকি : আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিসের জবাব দিয়েছেন পঞ্চগড়-১ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া। গতকাল দুপুরে নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মার্জিয়া খাতুনের আদালতে সশরীরে উপস্থিত হলে আদালতের নির্দেশনায় খাসকামরায় গিয়ে তিনি লিখিত জবাব দাখিল করেন।
গত ২ ডিসেম্বর পঞ্চগড় সদর উপজেলার মানিমাছপুকুরী বাজারে নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়ার উপস্থিতিতে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম পল্লব কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন করলে সেসব সমর্থককে হাড়হাড্ডি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সূত্রে জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম পল্লব তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘নির্বাচন যখন আসে, বড় নেতা, ছোট নেতা, মাঝারি নেতা, পাতি নেতা আর থাকে না। আমরা সবাই নৌকার কর্মী।
মমতাজ সমর্থকের হত্যার হুমকি : মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ্যে হত্যা ও পুলিশ প্রশাসন দিয়ে হয়রানির হুমকি দিয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে। এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদুর রহমানের (ভিপি শহিদ) বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সায়েদুল ইসলাম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মো. শহিদুর রহমান আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের সমর্থনে মাঠে নেমেছেন। অন্যদিকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সায়েদুল ইসলাম জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলুর পক্ষে কাজ করছেন। এ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিপন দেবনাথ বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। সতর্ক দৃষ্টি রাখছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাগুরায় আ.লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১০, ভাঙচুর : মাগুরার শ্রীপুরে আওয়ামী লীগের দুইপক্ষের সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ভাঙচুর করা হয় পাঁচটি বাড়ি। গতকাল বুধবার দুপুরে উপজেলার গয়েশপুর ইউনিয়নের ছাবিনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, দুপুরে গয়েশপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল হালিমের সমর্থক চুন্নু মিয়া তার নিজ গ্রাম ছাবিনগরের একটি জমিতে পেঁয়াজের ক্ষেতে কাজ করছিলেন। এ সময় তাদের প্রতিপক্ষ গয়েশপুর ইউনিয়নের পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউসুফ মণ্ডলের সমর্থকরা তার ওপর হামলা চালানোর জন্য চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এ সময় কৌশলে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে বাড়ি এসে আশ্রয় নেন চুন্নু মিয়া। এ ঘটনা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে আব্দুল হালিম ও গত ইউপি নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইউসুফ মণ্ডলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
দুইপক্ষের লোকজন ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে একে অন্যের ওপর হামলা চালালে অন্তত ১০ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে জিরাত মণ্ডল ও বকুল মোল্লাকে মাগুরা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষের সময় জহুরুল মোল্ল্যা ও বাদশা মণ্ডল নামে ইউসুফ মণ্ডলের দুই সমর্থকসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে পাঁচটি বাড়ি ঘর ভাঙচুর করা হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে গয়েশপুর ইউনিয়নের বর্তমান ইউপি সদস্য হান্নান মণ্ডল ও সেতু বিশ্বাস নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে গত ২৬ নভেম্বর সাকিব আল হাসানের মনোনয়ন লাভের পর তার পক্ষে এলাকায় আনন্দ মিছিল করেন ইফসুফ মণ্ডলের সমর্থক গয়েশপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্শেদ টুকুসহ অন্যরা। এরপর ইফসুফ মণ্ডলের প্রতিপক্ষ আব্দুল হালিম সমর্থকরা গত ৩ ডিসেম্বর লাঙ্গলবাঁধ বাজার এলাকায় গোলাম মোর্শেদ টুকুকে হাতুড়িপেটা ও কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনার পর থেকে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। যার জেরে গতকাল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে জানায় এলাকাবাসী।
শ্রীপুর থানার ওসি কাঞ্চন কুমার রায় জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মাগুরা জেলা পুলিশের এএসপি (সদর সার্কেল) দেবাশিস সরকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
এদিকে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা থেকে বের হওয়ার পর সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত সিকদারের গাড়িতে হামলা হয়েছে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবের সামনে এ ঘটনা ঘটে। শওকত সিকদার এই হামলার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য জোয়াহেরুল ইসলাম অনুসারীদের দায়ী করেছেন।
জানা গেছে, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে জেলা আওয়ামী লীগ গতকাল বর্ধিত সভার আয়োজন করে। এতে জেলার বিভিন্ন আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রাপ্তরা, জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা অংশ নেন। সভায় উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, সভা চলাকালে সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত সিকদার বক্তৃতাকালে জেলার সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলাম তাকে ধমক দিয়ে বসতে বলেন। এ সময় দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। সভা শেষে বের হয়ে গাড়িতে ওঠার সময় একদল যুবক শওকত সিকদারের দিকে ধেয়ে আসে। এ সময় শওকত সিকদার গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করে দেন। ওই যুবকরা তখন গাড়িতে এলোপাতাড়ি লাথি, হাত দিয়ে আঘাত ও গালাগাল করে। পরে গাড়িটি দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
এ হামলা প্রসঙ্গে শওকত সিকদার বলেন, সংসদ সদস্য জোয়াহেরুল ইসলামের অনুসারীরা তার গাড়িতে হামলা করেছে। হামলার বিষয়টি তিনি দলের নেতাদের জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জোয়াহেরুল ইসলাম বলেন, শওকত সিকদারের গাড়িতে হামলা হয়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে গাড়িতে দুই-চারটা থাপ্পড় দিয়েছে বলে শুনেছেন। এ ব্যাপারে তিনি মন্তব্য করবেন না বলে জানান। তবে তিনি অনুসন্ধান করছেন কারা এটা করেছে।
জোয়াহেরুল ইসলাম টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের সংসদ সদস্য। এবার তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য অনুপম শাহজাহান জয়। শওকত সিকদার অনুপম শাহজাহানের পক্ষের নেতা হিসেবে পরিচিত।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন রাজশাহী, পঞ্চগড়, মাগুরা ও সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি