চলে গেলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন

বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন আর নেই। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। ক্যানসারে আক্রান্ত মইনুল হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৫ ডিসেম্বর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর বারিধারা জামে মসজিদে মইনুল হোসেনের প্রথম জানাজা হবে। এরপর বাদ জোহর সুপ্রিম কোর্টে দ্বিতীয় জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে। প্রবীণ এই আইনজীবীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এক শোকবার্তায় প্রধান বিচারপতি মরহুমের বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এ ছাড়া বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পিরোজপুরের ভা-ারিয়া-কাঁঠালিয়া আসন থেকে নির্বাচিত হন। সংসদে তিনি নিবর্তনমূলক যেকোনো আইন পাসের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী রাষ্ট্রপতির ৫০ নম্বর আদেশ জারির সময় তিনি বিরোধিতা করেন। পরে সরকার আদেশটি রদ করে। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করে বাকশাল শাসন প্রবর্তন হলে প্রতিবাদস্বরূপ সংসদ সদস্য পদ থেকে তিনি ইস্তফা দেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পরে তিনি খন্দকার মোশতাক আহমেদের পরিচালিত দল ডেমোক্রেটিক লীগে যোগ দেন এবং ৩ নভেম্বর মোশতাক সরকারের পতন পর্যন্ত তিনি ডেমোক্রেটিক লীগেই ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশে গণতন্ত্র ও বেসামরিক সাংবিধানিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সক্রিয় উদ্যোগ নেন। গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক নেতাদের একটি ঐক্যমঞ্চে শামিল করতে তৎপর হন। দেশে একটি ভারসাম্যমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি ব্যক্তিগতভাবেও উদ্যোগ নেন। এই প্রক্রিয়া ফলপ্রসূ করার কাজে তিনি যখন ব্যস্ত ছিলেন, তখন সরকার তাকে ১৯৭৬ সালের নভেম্বর মাসে গ্রেপ্তার করে। তিন মাস ডিটেনশনে আটক রাখার পর ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

ওয়ান-ইলেভেনের পর তিনি এক বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় এবং সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথককরণে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে পিরোজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ছাত্রজীবনে স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে ব্যারিস্টারি পড়তে লন্ডন যান এবং মিডল টেম্পল-ইনে ভর্তি হন। সেখান থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে তিনি হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। 

যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের লন্ডন প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর ইত্তেফাক সম্পাদনার গুরু দায়িত্ব তিনি পালন করেন। ১৯৭৩ সালে ইত্তেফাকের সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি হন।

এ সময় তিনি কমনওয়েলথ প্রেস ইনস্টিটিউটেরও সদস্য ছিলেন। ইউরোপীয় কমন মার্কেট কমিশনের আমন্ত্রণে তিনি ব্রাসেলস পরিদর্শন করেন। চীনের জাতীয় দিবস উপলক্ষে ১৯৬৯ ও ১৯৮৯ সালে সরকারি প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ২০০০-০১ মেয়াদে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে তিনি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইংরেজি দৈনিক নিউনেশন পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন মইনুল হোসেন।

১৯৯০ সালে বহুল আলোচিত ‘৩১ জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি’র তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা এবং স্বাক্ষরদাতা। এই বিবৃতিতে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থে নির্দলীয় জাতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানানো হয়েছিল। দেশ ও জাতির বিপদকালে বিবেকবানদের নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকা উচিত নয়, এই উপলব্ধি থেকেই তিনি এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর মধ্যরাতে একাত্তর টেলিভিশনের টক শোতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে উদ্দেশ্য করে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য দায়ের হওয়া মামলায় জেলে যেতে হয় তাকে।

রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যাপারে উদার ও স্বাধীন মতামত রাখার জন্য তিনি ‘নিউ নেশন’ নামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেন, যা পরে দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। মইনুল হোসেন বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি ও প্রেস কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশে প্রথম গঠিত প্রেস কমিশনেও তাকে সদস্য করা হয়। প্রেস কমিশনের রিপোর্ট প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ : বাস্তবতা ও প্রত্যাশা’, ‘গণতন্ত্রের সাফল্য চাহিয়াছি’, ‘ঘুরে দাঁড়াতে হবে’, ‘আমার জীবন আমাদের স্বাধীনতা’, ‘বাংলাদেশ : কি চেয়েছি, কি পেয়েছি’, ‘অবিস্মরণীয় মানিক মিয়া’ প্রভৃতি।