অপরিকল্পিত মহাপরিকল্পনায় অপ্রয়োজনীয় ভবন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ১৯৬৮ সালে প্রথম মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) প্রণয়ন করেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে সেই মহাপরিকল্পনা মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, টাকা অপচয় করে যত্রতত্র অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। অংশীজনদের পরামর্শ ছাড়াই ভবনের নকশা পরিবর্তন করে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে বনাঞ্চল।

জাবি কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩৭৮টি বাসার মধ্যে প্রায় অর্ধেক ফাঁকা রয়েছে। এতগুলো বাসা ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও ১২০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে আরও ৬টি আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া দুটি প্রশাসনিক ভবন থাকা সত্ত্বেও ১৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথেই আরেকটি ভবন নির্মাণের চেষ্টা করছে প্রশাসন। সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ ছাড়াই নবনির্মিত ছয়টি হলের নকশা পরিবর্তন করে পরামর্শক ফি বাবদ ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। যাতে আগের নকশার চেয়ে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা। নির্মাণাধীন লেকচার থিয়েটারে ৬ হাজার শিক্ষার্থী ধারণক্ষমতা-সম্পন্ন ৬২টি ক্লাসরুম থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি ইনস্টিটিউটের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণের জন্য জায়গা ও অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আর এসব নতুন ভবন নির্মাণ করতে বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের সব অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকেরই দাবি, মহাপরিকল্পনা না মেনে অর্থ অপচয় করে অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে উন্নয়নকাজ করা হয়েছে, তা মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়নি। উন্নয়ন প্রকল্পের শুরু থেকেই আমরা মহাপরিকল্পনার দাবি জানিয়ে এসেছি, কিন্তু প্রশাসন মহাপরিকল্পনা ছাড়াই সবগুলো স্থাপনার কাজ করেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ১৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের অধীনে ২৩টি স্থাপনা নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপে ৬টি আবাসিক হলের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে একটি লাইব্রেরি ভবন, লেকচার থিয়েটার ও এক্সাম থিয়েটার ভবন, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সম্প্রসারিত ভবন, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৬টি আবাসিক ভবন নির্মাণকাজ চলমান।

এই উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরুর পর থেকে অ্যাকাডেমিক ভবন, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা, অতিথি ভবন, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, আবাসিক হল নির্মাণের জন্য অন্তত ১ হাজার ২০০টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। নবনির্মিত ৬টি হলের মধ্যে চালু হওয়া দুটি হলে বৃষ্টির পানি কক্ষে ঢোকাসহ পয়ঃনিষ্কাশন পাইপ ফেটে পুরো নিচতলা ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। ছাত্রীদের নতুন হল তিনটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে হওয়ায় গাড়ির হর্ন ও বিভিন্ন যানবাহনের শব্দে পড়াশোনাসহ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়া দশতলা ভবন নির্মাণের ফলে অতিথি পাখির ফ্লাইং জোন নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেছেন পাখি গবেষক ও পরিবেশবিদরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ত্রুটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের এরূপ ক্ষতির কারণ হিসেবে যথাযথ পরিকল্পনা না থাকাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মো. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘যেকোনো অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য মহাপরিকল্পনার দরকার হয়। কিন্তু আমার মনে হয় বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগরে কোনো মহাপরিকল্পনা নেই।’

ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের একাংশের আহ্বায়ক আলিফ মাহমুদ বলেন, ‘আদৌ কি কোনো মহাপরিকল্পনা রয়েছে? যদি মহাপরিকল্পনা মেনে কাজ করা হতো তাহলে কর্র্তৃপক্ষ এভাবে অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে গাছ কাটত না।’

পূর্ণাঙ্গ ও সুষ্ঠু মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গেল নভেম্বরে চলমান অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে নানা অপপরিকল্পনা, পরিবেশ ধ্বংস ও প্রকল্পের ডিজাইনার স্থপতি শেখ আহসান উল্লাহ মজুমদারের ভূমিকা প্রসঙ্গে পৃথকভাবে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর চিঠি দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন।

ওই চিঠিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে গত বছরের মে মাসে সিনেট হলে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহসান উল্লাহ মজুমদার জানান, ১৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনো মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি। আগের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি সংশোধনী (রিভাইজড) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু যে পরিকল্পনাটিকে মহাপরিকল্পনা বলা হচ্ছে, সেটি তা বলতে রাজি নন দেশের স্বনামধন্য নগর-পরিকল্পনাবিদরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আবুল কালাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপজালের (ডিপিপি) আলোকে যে সংশোধনী মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটিকে আসলে সম্পূর্ণরূপে একটি মহাপরিকল্পনা বলা যায় না। কারণ হচ্ছে, একটি মহাপরিকল্পনায় যে ধরনের সমীক্ষা থাকে, সেসব সমীক্ষার পূর্ণ সংযুক্তি এখানে নেই।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাপরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দীন বলেন, ‘স্থপতি মাজহারুল ইসলাম যে মহাপরিকল্পনা করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি কাজ এখনো সেই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়। প্রতিবার কোনো কাজের পরিকল্পনা করার সময় প্রথম মহাপরিকল্পনা সংশোধন করে নতুন পরিকল্পনাকে মহাপরিকল্পনার সংশোধিত ভার্সন হিসেবে ব্যবহার করা হয়।’

ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের একাংশের সভাপতি অমর্ত্য রায় বলেন, ‘অদ্ভুত জায়গায় অবকাঠামো নির্মাণ করা আসলে অপপরিকল্পনা। আমরা কেউই অপরিকল্পিত ভবন চাই না। বৃষ্টি হলে রাস্তায় পানি জমে, কোনো পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই।’

তবে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের আশ্বাস দিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহাপরিকল্পনা আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা ইতিমধ্যে দুটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছি। সেটা নিয়ে কাজ চলছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য দুটি আলাদা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে আড়াই কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। শিগগিরই আমরা মহাপরিকল্পনা হাতে পেয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করতে পারব।’