মনোনয়ন পেতে প্রতারণার ফাঁদে

সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র নির্বাচনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে টাকা আত্মসাতের জন্য প্রতারণার ফাঁদ পাতে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও এমন ফাঁদ পেতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার নাম করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকটি প্রতারক চক্রকে গ্রেপ্তারও করেছে। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে এক নেতা মনোনয়ন পাওয়ার আশায় প্রতারক চক্রের পাল্লায় পড়ে ৫০ লাখ টাকা খোয়ান। এ প্রতারক চক্রগুলো নিজেদের কখনো প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়, তার কার্যালয়ের সচিব, প্রটোকল অফিসার, পিএস-২, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে এ কাজগুলো করে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কেন্দ্র করে অনেকে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবণতাটা এত বেশি থাকে যে, তারা মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের ফাঁদে পা দেন। যাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে বা দুর্বলচিত্তের যে মনোনয়ন পেতেও পারে আবার নাও পারেন, তারাই কিন্তু বেশি এ ধরনের ফাঁদে পা দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের কাজে গোপনীয়তার বিষয় থাকে। গোপনে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাদের বিষয়ে খোঁজখবর করতে দ্বিধাবোধ করে। সে থেকেও প্রতারণার শিকার হন।’

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সচিব, পিএস টু ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ডেপুটি ডিরেক্টর (ডিডি) পরিচয়ের এক ব্যক্তি যোগাযোগ করলে ৫০ লাখ টাকা দেন ঠাকুরগাঁওয়ের এক আওয়ামী লীগ নেতা। কিন্তু মনোনয়ন না পাওয়ায় পরে বুঝতে পারেন তিনি প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন। এরপর তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হন। পরে পুলিশ এ ঘটনায় ঠাকুরগাঁওয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

এ বিষয়ে গত ৯ ডিসেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “মনোনয়নপ্রত্যাশী ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার রায়কে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনএসআইয়ের ডিডি মাহমুদুল হাসান পরিচয়ে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি কাজ করছেন এবং অনেকের মনোনয়ন কনফার্ম করেছেন। তার মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য ৫০ লাখ দাবি করেন। ওই সময় মোবাইল ফোনে অন্যপ্রান্ত থেকে একজন মহিলা কণ্ঠে বললেন আপনার মনোনয়ন ঠিক হয়ে গেছে, সমস্যা নেই। তার পরিচয় জানতে চাইলে ওই নেতাকে জানানো হয়, ওই নারী প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে ‘সায়মা ওয়াজেদ পুতুল’। আসলে ওই নারীও ছিল ওই প্রতারকদের একজন। প্রতারক চক্রটি তার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।”

শুধু এ ঘটনা নয়, গত ২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার আবু জাফর রাজুর পরিচয়ে বিভিন্ন প্রার্থীকে কোটি টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগে মনিরুল ইসলাম ভুট্টো (৩৫) নামে এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। গত ২৩ নভেম্বর নোয়াখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পরিচয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মো. ইয়াসিন (৪৬) ও তার মেয়ে সুরাইয়া ইয়াসমিনকে (২২) গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের রেকর্ড পাওয়া গেছে।

অন্য ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নিকটাত্মীয় পরিচয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মনোনয়নপত্র পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে আবু হানিফ তুষার ওরফে হানিফ মিয়া (৩৯) করতেন দরকষাকষি। কারও কাছে ৫০ কোটি, কারও কাছে ১০০ কোটি, আবার কারও কাছে ৩০০ কোটি টাকা দাবি করতেন তিনি। কিন্তু গত ১৭ অক্টোবর র‌্যাবের জালে ধরা পড়েন তিনি।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকে মরিয়া হয়ে থাকেন। আর নির্বাচন বা কোনো উপলক্ষে কিছু সুযোগসন্ধানী লোক প্রতারণার এ কাজ করার চেষ্টা করে। দিন দিন এটি করার প্রবণতা বাড়ছে বই কমছে না। কিন্তু প্রত্যাশীরা যখন গোপনে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে তখনই প্রতারকের শিকারে পড়েন। এ ছাড়া অনেক সময় ঝড়ে বক মনে ফকিরের কেরামতি বাড়ার মতো লেগে গেলে আবার ওই চক্রর বিশ^াসযোগ্যতা এবং তাদের রেটও বাড়ে। তবে দিনশেষে এসব ক্ষেত্রে নিজেদের সচেতন হতে হবে।’

যারা এ ধরনের প্রতারণার শিকার হন তাদের বিষয়ে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ জানান, যারাই তাদের কাছে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে জানিয়েছেন তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করে প্রতারকদের আইনের আওতায় নিয়ে এসেছেন। এমন প্রতারণার শিকার আরও কেউ থাকলে তাদের জানাতে পারেন। তারা বিষয়টি নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।