চোখের লেন্সের দাম নির্ধারণ হার্টের রিংয়ের দাম কমেছে

দেশে বিক্রি হওয়া সব ধরনের চোখের লেন্সের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১২ দেশের ২৯ ধরনের লেন্স রয়েছে। এসব লেন্সের সর্বনিম্ন মূল্য ১৪৩ ও সর্বোচ্চ মূল্য ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

গতকাল বুধবার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল ডা. মোহাম্মদ ইউসুফের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন দামের নির্দেশনা জারি করা হয়।

এর এক দিন আগে গত মঙ্গলবার একইভাবে হার্টের রিংয়ের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে দেয় অধিদপ্তর। আমদানিকারক ২৭টি প্রতিষ্ঠানের ৪০টির বেশি রিংয়ের নাম উল্লেখ করে আলাদা আলাদাভাবে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। রিংয়ের খুচরা দাম সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ ও সর্বনিম্ন ১৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে চোখের লেন্সের নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দিন, অর্থাৎ গতকাল থেকেই। হার্টের রিংয়ের দাম কার্যকর হবে আগামী শনিবার থেকে।

দুই বিজ্ঞপ্তিতেই বলা হয়েছে, নির্ধারিত এ দামের বেশি বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঔষধ ও কসমেটিকস আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঔষধ ও কসমেটিকস আইনে দুই বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারে অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের মূল্য নির্ধারণী তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ৪৯ ধরনের লেন্স আমদানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। এরপর রয়েছে ভারত। দেশটি থেকে আমদানি হচ্ছে ৪২ ধরনের লেন্স। এরপর যুক্তরাজ্য থেকে ১১ ধরনের, থাইল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি, বার্বাডোজ ও হাঙ্গেরি থেকে চার ধরনের, সিঙ্গাপুর, জাপান ও গ্রিস থেকে দুই ধরনের এবং স্পেন থেকে এক ধরনের লেন্স আমদানি হচ্ছে।

এসব লেন্সের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম জার্মানির ‘অ্যাট লিসা ট্রি টরিক ৯৪৯ এমপি পোস্টেরিয়র-চেম্বার ইন্ট্রাওকুলার লেন্স’ ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা। সবচেয়ে কম দাম ভারতের পলিমার ‘আই-ও-কেয়ার পিএমএমএ ইন্ট্রাওকুলার লেন্স’, ১৪৩ টাকা।

এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহবুব হোসেন বলেন, নতুন কিছু লেন্স বাজারে এসেছে, সেজন্য পুরনো তালিকায় নতুন করে সংযুক্ত করা হয়েছে। এতদিন সব লেন্স মূল্য নির্ধারণ করা ছিল না। সর্বশেষ ২০২০ সালের দিকে একবার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তিন বছর পর নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তকে ভালো বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এটার পক্ষে। সাধারণ মানুষ জানুক আমরা তাকে যে পণ্যটি দিচ্ছি সেটার মূল্য কত। আমাদের দেশে একসময় এক ধরনের লেন্স তৈরি হতো। এখন হয় না। এখন পুরোটাই বাইরে থেকে আনতে হয়।’

চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. দীপক কুমার নাগ বলেন, ‘দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভালো। মানুষ স্বস্তিতে লেন্স কিনতে পারবে।’

হার্টের রিংয়ের দাম কমেছে ২০-৪০ শতাংশ : অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হার্টের রিং আমদানিকারক ২৭টি প্রতিষ্ঠানের ৪৬টি রিংয়ের নাম উল্লেখ করে আলাদা আলাদাভাবে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। রিংয়ের খুচরা দাম সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার টাকা। এ তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমান বাজার দরের চেয়ে এসব রিংয়ের দাম ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

বেশি ব্যবহৃত হয় এমন রিংয়ের মধ্যে পোল্যান্ডের অ্যালেক্স প্লাসের দাম ৬২ হাজার ৫০০ থেকে কমে ৫৩ হাজার, আয়ারল্যান্ডের জিয়েন্স প্রাইম ৭২ হাজার ৫০০ থেকে কমে ৬৬ হাজার ৬০০, একই কোম্পানির জিয়েন্স এক্সপেন্ডিশন ১ লাখ ৮ হাজার ৬২৮ থেকে কমে ৯৩ হাজার ৫০০ ও জিয়েন্স অ্যালপাইন ১ লাখ ৪৯ হাজার থেকে কমে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা হয়েছে।

জার্মানির জিলমুসের রিংয়ের দাম ৬০ হাজার থেকে কমে ৫৩ হাজার, আয়ারল্যান্ডের মেডট্রোনিকের রেজোলুটে ওনিক্সের দাম ১ লাখ ৪৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন সায়েন্টেফিকের প্রোমুস প্রিমিয়ারের দাম ৭৫ হাজার থেকে কমে ৭৩ হাজার, প্রোমুস এলিটের দাম ১ লাখ ১২ হাজার থেকে কমে ৯৩ হাজার এবং একই কোম্পানির সিনার্জি ব্র্যান্ডের রিংয়ের দাম ১ লাখ ৫২ হাজার থেকে কমে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের বায়োম্যাট্রিকস নেওফ্লিক্সের দাম ৬২ হাজার ৫০০ থেকে কমে হয়েছে ৫৮ হাজার টাকা। একই কোম্পানির বায়োম্যাট্রিকস আলফা ৮৬ হাজার থেকে কমে হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা। নেদারল্যান্ডসের অ্যালবুমিনাস ডিইএস প্লাসের দাম ৭২ হাজার থেকে কমে হয়েছে ৫৪ হাজার টাকা।

কমানোর তালিকায় আছে সুইজারল্যান্ডের বায়োফ্রিডম, প্রি-কিনেটিক, আইট্রিকস, ওসিরা মিশন, আয়ারল্যান্ডের ডিইএসওয়াইএনসি, সুপরাফ্ল্যাক্স, জাপানের আল্টিম্যাস্টার, স্পেনের এনজিওলাইট, আইভাসকুলার এনজিওলাইট, আইএইটি ডেসটিনি, নেদারল্যান্ডসের কমবো প্লাস, ভারতের বায়োমিমে, ‘এভারমাইন-৫০’, মেটাফর, জার্মানির সিসি ফ্লাক্সে, ইকা লিমুস, ইউকোন চয়েস পিসি, অর্থস পিকো, আবিরস, করোফ্লিক্স আইএসআইআর প্রভৃতি কোম্পানির রিং।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, দেশে বছরে ৪০ হাজারের মতো রিং লাগে। জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বলেন, ‘রিংয়ের মূল্যভেদে ১৫-৪০ শতাংশ দাম কমেছে। ডলারের দাম কমা সত্ত্বেও সরকার দাম কমিয়েছে। রোগীদের জন্য খুবই ভালো হলো।’

জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান বলেন, ‘আরও কমানো উচিত, যাতে মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা পায়। এখন তদারকি করতে হবে যাতে কেউ বেঁধে দেওয়া মূল্যের বেশি নিতে না পারে।’