২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ডাকা হারতাল-অবরোধে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের ঘটনায় ব্যস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সুযোগে রাজধানীতে বেড়েছে ছিনতাই। গত এক মাসে ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন একজন। আহত হয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তাসহ অন্তত ১০ জন।
গত অক্টোবরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নতুন কমিশনার দায়িত্ব নিয়ে গত ৭ অক্টোবর ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে ডিএমপি সদর দপ্তর টাস্কফোর্স গঠন করেন। কিন্তু এতেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না ছিনতাই। এসব কখনো ঘটছে প্রকাশ্যে ফিল্মি স্টাইলে, আবার কখনো রাতের আঁধারে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, রাজনৈতিক কর্মসূচি, নাশকতা, সংঘাত, জ্বালাও-পোড়াও নিয়ন্ত্রণের কারণে তাদের ব্যস্ততা বাড়লেও সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রেও নজর রয়েছে। তারা বিভিন্ন সময়ে অনেক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তারও করেছে।
মানবাধিকারকর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এরমধ্যে রাজনৈতিক ডামাডোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এখন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিতে পারছেন না বিধায় ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে।
হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ নভেম্বর রাজধানীর বিমানবন্দর কাওলা রেলগেট এলাকায় সিভিল এভিয়েশনের গাড়িচালক আরমান আলী (২৬) ছিনতাইকারীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারা যান। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি ফেরদৌস আহমেদ বিশ্বাস।
একই দিন রাত ৮টার দিকে খিলক্ষেত কুড়াতলী এলাকায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মফিজুল ইসলাম (৪০) নামে এক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। ধারণা করা হয়, তিনি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলেন। পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় এখনো কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। গত ১৫ নভেম্বর সৌদি প্রবাসী আনোয়ার হোসেন মানিক (২৮), তার বড় বোন জান্নাতুল নাইম (৩৫), বড় বোনের স্বামী আবু তাহের (৪৫) ও ছোট বোন নুসরাত জাহান (২০) ছিনতাইকারীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন। সৌদি থেকে দেশে ফেরার পথে রাজধানীর ডেমরা এলাকায় তারা এই ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন।
গত ২৫ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী ধলপুরে বউবাজার আল কারিমা হাসপাতালের পাশের একটি গলিতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে হৃদয় (২৬) নামে এক ভ্যানচালক আহত হন। ২৭ নভেম্বর রায়েরবাজারে ছুরিকাঘাতে প্রাইভেট কারচালক মেহেদী হাসান রাব্বি (২৫) ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী জাহাঙ্গীর আলম (২২) আহত হন। পরদিন যাত্রাবাড়ী শনির আখড়ায় প্রাইভেটকার চালক শহিদুল ইসলাম (৫৫) ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত হন। গত ১ ডিসেম্বর মৎস্য ভবন এলাকায় রিকশারোহী উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মাহমুদা বেগম (৪৫) ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, ২০২২ সালে রাজধানীতে ২৪৮টি অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে ২১টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মোট ২৩৫টি অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে ২৯টি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
ডিএমপি উপকমিশনার (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ) ফারুক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীতে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি লোকের বসবাস। এখানে তাই কিছু ঘটনা ঘটে থাকে। এত জনসংখ্যায় শহরে অপরাধ তো একেবারে শূন্যতে নামিয়ে আনা যায় না। তবে এগুলো নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে পুলিশ ব্যস্ত থাকায় এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘রাজনীতির সঙ্গে এটা সম্পর্কিত না। যারা ছিনতাই করে তারা ওই কাজই করে থাকে। তাদের গ্রেপ্তারে আমাদের থানা পুলিশসহ গোয়েন্দারাও কাজ করে প্রতিনিয়ত।’
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ নভেম্বর ধানম-ি এলাকায় ছিনতাইকালে প্রাইভেটকার ও দুটি চাপাতিসহ নুর আলম হাবু ও আলমাস নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন শাহবাগ থানা এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে জহির, পলাশ ও ইয়াসিন নামে তিনজনকে একটি সুইজ গিয়ার চাকুসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ১২ নভেম্বর ‘বড় ভাই ডাকছেন’ বলে ছিনতাই করা চক্রের অরিন (২৬), জামাল উদ্দিন সাগর (২৭), রনি (৩০) ও ইব্রাহিম ওরফে ইমন (১৯) নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৭ নভেম্বর মিরপুর মনিপুর বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ছিনতাইয়ের অভিযোগে জনি (২৩) ও সাগর (২৪) নামে দুই ছিনতাইকারীকে এবং ১ ডিসেম্বর মিরপুর এলাকায় ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে তিনটি চাকুসহ হৃদয় (১৯), রুমান (২০) ও সুজন (১৯) নামের তিনজন গ্রেপ্তার হয়।
সন্ত্রাস দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কাজ করছে। তাদের তথ্য মতে, ছিনতাইয়ের অভিযোগে ২০২২ সালে ২ হাজার ৬২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেমম্বর পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯৯৭ জনকে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক ইমরান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনের বিভিন্ন কাজে সার্বিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আমরা আমাদের নিয়মিত অপরাধ দমনের কাজও সমানতালে করে যাচ্ছি। আমাদের সাইবার পেট্রোলিং, টহলসহ গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জঙ্গি, ছিনতাইসহ অপরাধ যেন না বাড়তে পারে সে ব্যাপারে সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।’