লাগাতার গোলা, মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ, হুড়মুড়িয়ে খসে পড়া ভবন, তীব্র আর্তনাদ আর অসংখ্য মৃত্যু নিয়ে আরও একটি দিন পার করল গাজাবাসী। তবে গেল দুই মাসে এসব সয়ে যাওয়া গাজাবাসীর জন্য গতকাল বুধবার ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার রাতেই গাজায় মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে ১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। ওইদিনই যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর আহ্বান জানিয়েছে বলেছেন, গাজায় নির্বিচারে বোমা হামলা চালিয়ে ইসরায়েল বিশ্ব জুড়ে সমর্থন হারাচ্ছে। সেদিন হামাসের যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াইয়ে কর্নেলসহ অন্তত ১০ সেনাসদস্য হারিয়েছে ইসরায়েল; যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক দিনে সর্বোচ্চ। ঘটনাবহুল মঙ্গলবারের পর বুধবার আরও চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিয়েছে ইসরায়েল। হামাসের টানেল নেটওয়ার্ক অকেজো করতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, সুড়ঙ্গে সাগরের পানি ঢোকানো শুরু করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
এদিকে আলজাজিরা, বিবিসি ও আনাদলুর প্রতিবেদন বলেছে, গতকাল অবধি গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ১৮ হাজার ৬০০ জনে পৌঁছেছে। আহত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৫০ হাজার। গাজার দুই-তৃতীয়াংশ হাসপাতালের সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আহতদের অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
টানেলে পানি ঢালছে ইসরায়েল : গতকাল মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতিমধ্যে সুড়ঙ্গে পানি ঢোকানো শুরু হয়ে গেছে, প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ইসরায়েলি সেনারা মনে করে, হামাস তাদের হাতে আটকদের এসব সুড়ঙ্গে আটকে রেখেছে। এ ছাড়া এখানে তাদের যোদ্ধা ও অস্ত্রশস্ত্রও মজুদ রয়েছে, এসব সুড়ঙ্গেই বসছে হামাসের অপারেশনের বৈঠক। ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের গাজায় স্থলাভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এসব সুড়ঙ্গ ধ্বংস করা। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সাগরের পানি প্রবেশ করিয়ে সুড়ঙ্গ অকেজো করতে গিয়ে গাজার মিঠা পানির সরবরাহকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। ওয়ালস্ট্রিট বলছে, গাজার সুড়ঙ্গগুলোতে সাগরের পানি প্রবেশ করানোর জন্য গত মাসে ইসরায়েলি বাহিনী পাঁচটি বিশাল পাম্প স্থাপন করে। প্রথম পাম্পটি বসানো হয়েছে আল-শাথি আশ্রয়শিবিরের উত্তরে। এসব পাম্পের প্রতিটি হাজার হাজার কিউবিক মিটার পানি সুড়ঙ্গগুলোতে ঢোকাতে সক্ষম।
কর্নেলসহ ১০ সেনাসদস্য হারিয়েছে ইসরায়েল : হামাসের যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াইয়ে মঙ্গলবার এক দিনেই কর্নেলসহ অন্তত ১০ সেনাসদস্য হারিয়েছে ইসরায়েল। এ দিনটি ছিল গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন। এদিন এলিট গোলানি ব্রিগেডের ওই কমান্ডারসহ ১০ সেনা নিহত হয়। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বুধবার এ কথা জানিয়েছে। এ নিয়ে গাজায় স্থল অভিযানে ১১৫ ইসরায়েলি সেনা নিহত হলো।
সমর্থন হারাচ্ছে ইসরায়েল বাইডেন : গাজায় নির্বিচারে বোমা হামলা চালানোর কারণে ইসরায়েল বিশ্ব জুড়ে সমর্থন হারাচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের নেতৃত্বের সমালোচনা করে এটাই সবচেয়ে কড়া বিবৃতি। বাইডেন বলেন, ইসরায়েল তার নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে। এ ছাড়া তাদের পাশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আছে, পুরো বিশ্ব আছে। কিন্তু নির্বিচারে বোমা হামলার মাধ্যমে তারা সে সমর্থন হারাচ্ছে। তিনি এ কথাও বলেছেন যে, হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইসরায়েলের সমালোচনা করলেও গাজায় সামরিক অভিযানের জন্য আমেরিকা যে সহায়তা দিচ্ছে, সেখান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মন্তব্য করার পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, গাজায় হামলা চালিয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সমর্থন থাক বা না থাক, ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
লোহিত সাগরে ইসরায়েলের চার যুদ্ধজাহাজ : ইসরায়েলগামী যেকোনো জাহাজে হুতিদের হামলার হুমকির পর লোহিত সাগরে চারটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে ইসরায়েল। দেশটির সেনাবাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের এক পোস্টের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের হামলার ঝুঁকি সামাল দিতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে ইসরায়েল।
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা যুদ্ধে সাগরে আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছে আইএনএস মাগেন, ওজ, আতজমাউত ও নিতজাহোন। এগুলো এখন লোহিত সাগরে হুতিদের আক্রমণ মোকাবিলাতেও সক্রিয়। নতুন যুদ্ধজাহাজগুলো ইসরায়েলের সা’র-৬ শ্রেণির করভেট বহরের অংশ। এ বছরের শুরুতে ইসরায়েলের গ্যাসক্ষেত্র এবং শিপিং লেনগুলো রক্ষার জন্য মূলত এসব জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে।
সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস : গাজায় মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে ১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। গত মঙ্গলবার প্রস্তাবটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়। যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোট দেয় ১৫৩টি দেশ। ২৩টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ ১০টি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়। যদিও রেজল্যুশনটি বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি বিশ্বব্যাপী মতামতের সূচক হিসেবে কাজ করে।
ভোটের পর জাতিসংঘে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই যারা এ রেজল্যুশনে সমর্থন জানিয়েছেন, যেটি সবেমাত্র বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হলো। তিনি বলেন, এটি রেজল্যুশন কার্যকর করার আহ্বান জানানোর জন্য আন্তর্জাতিক অবস্থানকেই প্রতিফলিত করে। এর আগে গত শুক্রবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব উঠলেও তা ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্র এতে ভেটো দেয়।