আগুন দিনের আখ্যান

ইতিহাসবিদ, শিক্ষক, সাংবাদিক মুনতাসীর মামুনের লেখালিখির শুরুটা শিশুসাহিত্য দিয়ে হলেও অন্য পরিচয়ের আড়ালে প্রায় ঢাকা পড়েছে তার শিশুসাহিত্যিক পরিচয়টি। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি সচেতন মুনতাসীর মামুন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সক্রিয় কর্মী ও সাক্ষী। ‘জয় বাংলা’ তার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আশ্রয়ী কিশোর উপন্যাস।

১৯৬৯-১৯৭১ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী স্বাধীনতা সংগ্রামে, একটি স্বাধীন দেশের দাবিতে একত্র হয়েছিল, যূথবদ্ধ হয়েছিল। সেই কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের নিয়ে রচিত এই উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে তখনকার ঝড়ো দিনগুলো।

সে সময়ে আপামর বাঙালিদের কাছে ‘জয় বাংলা’ সেøাগানটি হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত প্রিয়। পরিণত হয়েছিল অসীম শক্তির আধার, অনুপ্রেরণার বীজমন্ত্র। রণাঙ্গনে ও প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষণে ক্ষণে জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে নিজেদের অনুপ্রাণিত করেছেন।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কামাল। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ’৬৯, ’৭০ এর আন্দোলনের মূল কেন্দ্রও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে বাঙালির উদ্বোধন দেখানো হয়েছে ‘জয় বাংলা’ উপন্যাসে।

কামাল সাধারণ ছাত্র নয়, সে একটি পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদকও। সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের তাগিদেই তাকে আন্দোলনের কা-ারিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হয়েছে। উপন্যাসে উপস্থিত হয়েছেন মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবসহ অন্য নেতারা। একই সঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা, ফয়েজ আহমেদ, হাশেম খান প্রমুখ।

কামালের বন্ধু অনিল, আসাদ। তারাও উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। শহরের সর্বত্র তাদের বিচরণ। যেখানে আন্দোলন সেখানেই তারা। পাঠক তাদের সঙ্গেই ঘুরে বেড়াবে শহরময় অগ্নিঝরা দিনগুলোতে। শুধু রাজধানী শহরে নয়, কামালের দাদাবাড়ি ফেনীর একটি অজপাড়াগাঁয়েও শুরু হয় তোলপাড়।

কামালের বাবা-মা, দোলা, দোলার পরিবার সবই যেন তখনকার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর প্রতিবিম্ব। তাদের উপস্থিতি সে সময়ের সার্বিক পরিস্থিতিকে করেছে মূর্ত।

একাধারে লেখক ও ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানের দরুন মুনতাসীর মামুনের এই উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে সে সময়ের অন্যতম দলিল। নতুন প্রজন্মের পাঠক যারা মুক্তিযুদ্ধকে দেখেনি, কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধেছিল জানে না তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই বইটি।

 চৌধুরী শ্রাবন্তী বড়ুয়া