শ্রদ্ধায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ

শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় জাতি স্মরণ করেছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। মিরপুর বধ্যভূমিতে ও রায়ের বাজারে ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়েছে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। দেশের সব জেলা, উপজেলা ও বিদেশের দূতাবাসগুলোও স্মরণ করেছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।

ভোরের আলো ফুটতেই দেশের স্মৃতিসৌধগুলোতে ঢল নামে মানুষের। পায়ে পায়ে সবার গন্তব্য বধ্যভূমি, শহীদ মিনার। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির সেরা সন্তানদের হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী, ঘটিয়েছিল নৃশংস এক হত্যাকা-।

গতকাল বৃহস্পতিবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের কণ্ঠে ছিল উন্নত-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। ছিল ইতিহাস বিকৃতকারীদের রুখে দেওয়ার শপথ। সাম্প্রদায়িক শক্তির ধারক-বাহকদের প্রত্যাখ্যান এবং নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগিয়ে তুলতে সঠিক ইতিহাসের চর্চার দাবিও ছিল।

দিবসটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকালে কালো পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন, শোকর‌্যালি, শ্রদ্ধা নিবেদন, চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান ও হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

১৯৭১ সালের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পরিকল্পিতভাবে দেশের কৃতী সন্তানদের হত্যা করে। তারপর থেকে দিনটি শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাতে সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে মানুষের ঢল নেমেছিল। সূর্যোদয়ের আগেই হাজারো মানুষ ভিড় করেন স্মৃতিসৌধের সামনে। সবার হাতে ছিল ফুলের তোড়া। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে লেখা কালো ব্যানার ছিল।

সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের বেদিতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সে সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। শহীদদের সম্মানে সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।

পরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সে সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও আফজাল হোসেন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পরে একে একে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, শহীদ পরিবারের সন্তান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা।

এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে স্বাধীনতার মহান স্থপতির প্রতি সম্মান জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে আরেকবার পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

সে সময়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিম-লীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, ড. আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, মাহাবুবউল আলম হানিফ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সে সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া বিএনপি, জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ, আওয়ামী যুবলীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, জাতীয় শ্রমিক লীগ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, ঢাকা মহানগর উত্তর এবং দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য চক্রান্ত করে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। অনেক বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে স্থাপিত আলবদর ঘাঁটিতে নির্মম নির্যাতনের পর রায়ের বাজার বধ্যভূমি ও মিরপুরের জলাভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. ফজলে রাব্বি, সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার, সিরাজুদ্দীন হোসেন, নিজামউদ্দীন আহমেদ, এস এ মান্নান, সাংবাদিক ও কবি সেলিনা পারভীন, সাহিত্যিক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, গিয়াসউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। বুদ্ধিজীবী হত্যার ঠিক দুদিন পর ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বাধীন বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।