ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশী এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি। তাই এ খাতে অনেক বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সরকারকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং ট্যারিফ (বিদ্যুতের মূল্য) নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে নিরপেক্ষ কোন সূত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনেশিয়েটিভের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান অবস্থা, অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ নিয়ে ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়ন অনুসরণ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রায় ১৭ টাকা (মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকা হিসাবে) দরে কিনছে। অন্যদিকে পাকিস্তানে এই দাম মাত্র সাড়ে ৩ টাকার মতো। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ দাম ৫ টাকা ৮৩ পয়সা। ভিয়েতনাম, জাপান ও থাইল্যান্ডে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম যথাক্রমে ৯.২৪, ১০.২৩ ও ১৩.৩১ টাকা।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা (এমসিপি) অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সৌরশক্তি থেকে ৪৬১ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং আরও ৪ হাজার ১১৫ মেগাওয়াট প্রকল্প পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
চেঞ্জ ইনেশিয়েটিভের গবেষণায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রায় অসংগতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদনের অনিয়ম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অতিরিক্ত ট্যারিফের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সৌরবিদ্যুতের দক্ষতা বেশি হলেও সেখানে তুলনামূলক কমসংখ্যক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ এলাকায় দক্ষতা কম হলেও সেখানে বেশি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চেয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে জাকির হোসেন বলেন, বর্তমান পরিসরে বাংলাদেশের জন্য সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও জৈবশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিই নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি। প্রমাণিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির চেয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে জ্বালানি নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সাশ্রয়তা ও জ্বালানি দুষ্প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ নীতিগত পরিবর্তনটি সাম্প্রতিক জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থানেরও বিপরীত।
জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ এবং চেঞ্জ ইনেশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের টেকসই অগ্রগতি নির্ভর করছে প্রকৃতিনির্ভর, সাশ্রয়ী ও সার্বভৌম নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার ওপর। কোনো অবস্থাতেই দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল যেন এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এখতিয়ার খর্ব করে অযৌক্তিক ট্যারিফের মাধ্যমে অনৈতিক ফায়দা লুটতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে না পারে সেটি খেয়াল রাখতে হবে। কোনোভাবে সম্ভাবনায় খাতটি বিতর্কিত হয়ে গেলে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। সব মিলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ব্যাহত হবে।’
প্রতিবেদনে সরকারি ও বেসরকারি ট্যারিফের পার্থক্যের বিষয়টিও তুলে ধরে বলা হয়, বেসরকারি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৩ সেন্ট (সাড়ে ১৪ টাকা) করে আদায় করছে। বিপরীতে সরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম পড়ছে ১০ সেন্ট (১১ টাকা)। এ ছাড়া যৌথ উদ্যোগের (সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন) প্রকল্পগুলোতেও সরকারি প্রকল্পের তুলনায় বিদ্যুতের দাম বেশি। বেশিরভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পই উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রতিযোগিতা না থাকায় বিদ্যুতের দাম ইচ্ছেমতো আদায় করছে বিভিন্ন কেন্দ্রের মালিকরা।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ট্যারিফের হার বিভিন্ন মালিক এবং ধারণক্ষমতার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোতে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন নির্ধারকের ওপর ভিত্তি করে ট্যারিফ হার (বিদ্যুতের মূল্য) নির্ধারণ করে এবং বিভিন্ন প্রকল্পের বিস্তারিত ব্যয় অনুমান এবং ট্যারিফের হার প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের স্বচ্ছতা নেই। চলমান জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে জ্বালানি খাতে শুদ্ধাচার ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বেশ কয়েকটা সুপারিশ তুলে ধরা হয় চেঞ্জ ইনেশিয়েটিভের গবেষণায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উচ্চ সৌরবিকিরণ এবং বাতাসের গতিসম্পন্ন অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো; নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের জন্য পাওয়া অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত; প্রতিযোগিতামূলক প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অনুদান এবং সুবিধাজনক তহবিলের নিশ্চয়তা, ঝুঁকিও ঋণ ফেরতের সক্ষমতা বাড়াতে ও অর্থায়ন চাহিদা মেটানোর জন্য কার্বনট্যাক্স এবং অনুরূপ উদ্ভাবনী আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণ; একটি বিস্তৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়ন কৌশল তৈরি ইত্যাদি।