শেষ আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি

সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ে চলমান আন্দোলনে বিজয় অর্জন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তাই চলমান আন্দোলন সফল করতে শিগগিরই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে এক মঞ্চে আনার কাজ চলছে। এমনটিই বলছে বিএনপির শীর্ষ নেতারা। বিএনপির নেতারা বলেন, শেষ আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পিঠা ভাগাভাগির যে প্রক্রিয়া চলছে তাতে সবাইকে আওয়ামী লীগ সন্তুষ্ট করতে পারবে না বলে মনে করছেন তারা। যারা অসন্তুষ্ট থাকবে তাদের বিরোধী আন্দোলনে শামিল হতে অনুরোধ জানিয়েছেন নেতারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলমান আন্দোলন-সংগ্রামের গতি-প্রকৃতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপ-আলোচনা চলছে প্রতিনিয়ত। দলগুলোর কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা আসছে। সেগুলো পর্যালোচনা চলছে। আপাতত যুগপৎ আন্দোলন চলছে। সামনের দিনে আবার ধরন পাল্টে যেতে পারে। চলমান আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপাতত হরতালের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সামনে আরও কর্মসূচি আসবে।’

তবে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক একটি দলের শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলমান আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে এবং শেষ আঘাত হানতে এক মঞ্চে আসা যেতে পারে। তবে এখনই সবাইকে এক মঞ্চে আনা ঠিক হবে না। এতে বরং আন্দোলন সফল হওয়ার পরিবর্তে ব্যর্থ হতে পারে। দেশে-বিদেশে খারাপ বার্তা যেতে পারে।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারবিরোধী যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে সরার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে আন্দোলনের প্রধান দল বিএনপি। আমাদের সঙ্গেও আলোচনা হচ্ছে। আন্দোলনে সফলতা পেতে নানামুখী চিন্তাভাবনা রয়েছে। তবে কখন কী সিদ্ধান্ত আসবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি বলে দেবে কী করতে হবে।’ 

বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তা নজিরবিহীন। দেশে কি জরুরি অবস্থা জারি হচ্ছে? কারণ কেবলমাত্র মার্শাল ল বা জরুরি অবস্থার সময়ই সভা-সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার এভাবে স্থগিত করা হয়। গত ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে এমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচন সামনে রেখে সভা-সমাবেশের অধিকার খর্ব করতে এমন ভাষায় বিজ্ঞপ্তি  দেওয়া নজিরবিহীন। আমরা এ সিদ্ধান্ত মানব না; বরং আন্দোলন-সংগ্রাম জোরদার করব।’ তিনি বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের সিট ভাগাভাগি পৃথিবীর কোথাও নেই। বিশে^র কোথাও ভোট চুরি করে না।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দলের একটি সেøাগান রয়েছে, সেই সেøাগান হলো নানান মানুষ নানান মত, দেশ বাঁচাতে ঐক্যমত। এই সেøাগান সামনে রেখে ডান, বামসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য হয়েছে। এই ঐক্যের পরিধি আগামীতে বাড়বে আশা করি। এরপর রাজপথে চলমান আন্দোলনে সফলতা পেতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন দলের হাইকমান্ড।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশন একতরফা তফসিল ঘোষণার পর একধরনের আন্দোলন হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যুগপৎভাবে আন্দোলন করেছে। সেই আন্দোলন পর্যালোচনা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত যেভাবে আন্দোলন চলছে তাতে আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলা নিয়ে সন্দিহান আমরা। তাই কৌশল বদল করার চিন্তাভাবনা চলছে। এর অংশ হিসেবে বিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে এক মঞ্চে আনার চেষ্টা চলছে।’

দলটির নেতারা বলছেন, সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ের চলমান আন্দোলন-সংগ্রাম বানচাল করতে সরকার বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিজ্ঞপ্তি অনুসারে ওই দিন থেকে নির্বাচনী প্রচারে বাধা হতে পারে এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে হবে। সরকারের এমন অনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই দিন হরতাল ডাকা হয়েছে। এখন যুগপৎভাবে কর্মসূচি পালন করা হলেও বিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে এক মঞ্চে আনার চেষ্টা চলছে। শেষ সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিএনপির হাইকমান্ডই সিদ্ধান্ত নেবেন।

গত ২৮ অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় দলীয় মহাসমাবেশ পন্ড হওয়ার পর থেকেই বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো একতরফা নির্বাচনের প্রতিবাদে এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে হরতাল, অবরোধ পালন করে আসছে। এরই মধ্যে গতকাল বিকেলে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কাল সোমবার হরতালের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘এটা মানুষের পক্ষের হরতাল, গণতন্ত্রের পক্ষের হরতাল, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের হরতাল, নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষের হরতাল। আমি আপনি আমরা যারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই, তাদের জন্য এই হরতাল। এই হরতাল কারও কৃতদাস হওয়ার জন্য নয়। একটি একদলীয় নিষ্ঠুর কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে আমরা প্রত্যেকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হব, সেটির বিরুদ্ধে এই হরতাল।’