গান, আড্ডা, কবিতার সঙ্গে স্বপ্নপূরণ ও লক্ষ্য নির্ধারণের গল্প। পাঁচ বছর আগে যাত্রা শুরু করা দেশ রূপান্তরের উদ্যমী ও উদ্যোগী কর্মীদের মুখে মুখে ফিরেছে এই গল্প। প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে আরও দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন লক্ষ্য অর্জনে অবিচল কর্মীরা।
গতকাল বুধবার (২০ ডিসেম্বর) ছয় বছরে পা দিয়েছে ইতিমধ্যে পাঠকের আস্থা অর্জন করা দেশ রূপান্তর। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ দিনটি ছিল প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের জন্য একটি প্রাণবন্ত দিন। দিনভর প্রাণখোলা হাসি আর আনন্দময় মিলনমেলার উপলক্ষ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশ রূপান্তরের প্রতিটি কর্মীর জন্য ছিল নির্ধারিত রঙের পোশাক। শুধুই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না এ আয়োজন। বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা তাদের আশা, সম্ভাবনা আর চ্যালেঞ্জ উতরানোর গল্প বললেন প্রাণখুলে। দেশ রূপান্তরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত অমিত হাবিবের হাতে তৈরি এ প্রতিষ্ঠানটি সামনের দিকে আরও এগিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশার কথা শোনালেন সবাই।
রাজধানীর বাংলা মোটরে রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারে দেশ রূপান্তরের কার্যালয়ে দিনভর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় কয়েকটি পর্বে। বিকেল ৩টার কিছু পর শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের একটি পর্বে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রাণবন্ত বিকেলে নিজেদের মতো করে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। সন্ধ্যায় সেরা কর্মীর পুরস্কার, র্যাফেল ড্রয়ের মতো আয়োজনে উচ্ছলতায় ভরে ওঠে প্রিয় প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন। এই দিনে অনেকেই এসেছিলেন শুভেচ্ছা জানাতে।
অনুষ্ঠান শুরু হয় দেশ রূপান্তরের প্রধান প্রতিবেদক আশরাফুল হক রাজীবের প্রাণবন্ত সঞ্চালনার মধ্য দিয়ে। তিনি তার সহকর্মীদের দেশ রূপান্তরের শুরুর পথচলা, বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা আর ভবিষ্যতে তার সহকর্মী প্রতিবেকদের উদ্বুদ্ধ হওয়ার কথা বলেন। অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখ করার মতো বিষয় ছিল প্রতিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানকে তাদের প্রতিদিনের কর্ম, ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ ও স্বপ্নপূরণের এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলার সুযোগ দেওয়া। একে একে প্রতিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানরা সে গল্পই বললেন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন পুরনো ও বর্তমান সহকর্মীদের সঙ্গে তার মজার সব ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। সম্পাদকদের স্বভাবসুলভ ভাবগাম্ভীর্যের বাইরে সহকর্মীদের সঙ্গে তিনি নানা হাস্যরসে মেতে ওঠেন। ভবিষ্যতে আরও ভালো করার প্রেরণা দেন তিনি। সহকর্মীরাও তার এ প্রাণবন্ত আচরণ বেশ উপভোগ করেন।
একটি পত্রিকার অন্যতম প্রাণ সার্কুলেশন বিভাগ। সার্কুলেশন যত বাড়ে পাঠকের চাহিদাও বাড়ে সমানতালে। শুরুর সময় থেকে সার্কুলেশন ধরে রেখে পত্রিকা বিক্রির আগের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের এ কাজটি কীভাবে সম্পাদন করেন সেই গল্প শোনান সার্কুলেশন বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক আব্দুল হাকিম। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে দেশ রূপান্তর অনলাইনে প্রায় ৭০ লাখ পাঠক বাড়ানোর চ্যালেঞ্জের গল্প শোনালেন এ বিভাগের ইনচার্জ আনিসুর রহমান বুলবুল। চলতি ডিসেম্বরে অনলাইনে পাঠক সংখ্যা এক কোটিতে এবং আগামী বছর তা দুই কোটিতে পৌঁছাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দেশ রূপান্তরের ডিজিটাল বিভাগ এগিয়ে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। কীভাবে এটি সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সম্ভব করছেন সেই স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণের গল্প শোনালেন এ বিভাগের ইনচার্জ আপেল মাহমুদ। মাত্র কয়েক মাসে দেশ রূপান্তরে একেকটি ভিডিও ভিউ হচ্ছে মিলিয়নের বেশি। আগামী বছর ডিজিটাল বিভাগে তার লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
নিয়মিত বিজ্ঞাপন ও পাওনা আদায় ছাড়া সংবাদপত্রের এ ব্যয়বহুল সময়ে কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব কাজ। তবে লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি যাওয়ার কথা শোনালেন এ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. হারুনের রশিদ।
খেলা মানেই দেশ রূপান্তরে অন্যরকম ও ব্যতিক্রম আয়োজন। হোক সেটি বিশ্বকাপ ফুটবল, বিশ্বকাপ ক্রিকেট কিংবা দেশে বা বিদেশে বৈশ্বিক কোনো আসর। দেশ রূপান্তরের স্পোর্টস এডিটর সাইফুর রহমান খোকন বললেন, একটি আসর ঘিরে পত্রিকাটির পরিকল্পনা ও খেলাপ্রিয় মানুষদের চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখে আয়োজনের কথা।
নিজেদের বিভাগ নিয়ে আরও ভালো করার প্রত্যয় নিয়ে নতুন বছরে নতুন চিন্তাভাবনার কথা শোনালেন ফিচার ইনচার্জ মোহসীনা লাইজু, সহকারী সম্পাদক (সম্পাদকীয় বিভাগ) তাপস রায়হান, মফস্বল বিভাগের ইনচার্জ নিয়াজ মাহমুদ, চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট দেলোয়ার হোসেন, প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ কবির, আইটি বিভাগের ইনচার্জ মাহমুদ খান, সম্পাদনা সহকারী বিভাগের নবীউল নেওয়াজ রাসেল।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে রূপায়ণ গ্রুপের উপদেষ্টা আব্দুল গাফফার বক্তব্য রাখেন। শুরুতে এ প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুনসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশ রূপান্তরের এখন যে অবস্থান তাতে অচিরেই এই পত্রিকাটি আরও শীর্ষ পর্যায়ে যাবে। আমাদের উচ্চারণ হবে, আমি নই, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করব এবং এটি করলে অবশ্যই নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করি।’
বার্তা সম্পাদক শাহ আলম বাবুল বলেন, ‘অমিত হাবিবের হাতে তৈরি এ প্রতিষ্ঠানটির এখন এগিয়ে যাওয়ার সময়। তবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজন প্রতিটি কর্মীর আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করলেই সেটি সম্ভব হবে।’
অনুষ্ঠানের দুটি আকর্ষণের একটি ছিল বছরের সেরা কর্মীর পুরস্কার। ব্যতিক্রমী এ আয়োজন ছিল মফস্বল ও ঢাকার অফিসকেন্দ্রিক কর্মীদের ঘিরে। কারা হচ্ছেন সেরা কর্মী এ নিয়ে কৌতূহল ছিল সবার মধ্যে। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে জানা যায় তাদের নাম। চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মোট ছয়জন সেরা কর্মী বাছাইয়ের গল্প শোনান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন। তিনি বলেন, এত কর্মীর ভিড়ে সেরা কর্মী বাছাই আসলে একটা কঠিন চ্যালেঞ্জের মতো ছিল। একজন সেরা হয়ে খুশি হবেন। কেউ মন খারাপ করবেন। কিন্তু দিন শেষে সেরা কর্মীকে বেছে নিতে হয়। আর যিনি এবারের সেরা কর্মীর তালিকায় থাকবেন না, তারও হতাশার কিছু নেই। তিনি পরবর্তী সময়ে সেরা হওয়ার চেষ্টা করবেন বলে প্রত্যাশার কথা বলেন মোস্তফা মামুন।
তিনি প্রথমে সেরা কর্মী বাছাইয়ে তালিকায় থাকা বিভিন্ন বিভাগের এমন ১৫ জনের নাম ঘোষণা করেন। চূড়ান্তভাবে সেরা ছয় কর্মীকে ক্রেস্ট, সম্মাননা ও নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয়।
বিভাগীয় পর্যায়ে দেশ রূপান্তরের সেরা কর্মীর তালিকায় স্থান করে নেন চট্টগ্রামের নিজস্ব প্রতিবেদক ভূঁইয়া নজরুল। তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন মোস্তফা মামুন। জেলা পর্যায়ে সেরা কর্মী বিবেচিত হন দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি কুরবান আলী। তিনি ফটো এডিটর সাহাদাত পারভেজের হাত থেকে পুরস্কার নেন। উপজেলা পর্যায়ে সেরা কর্মীর তালিকায় স্থান করে নেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলা প্রতিনিধি সোহেল সানি। তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন বিশেষ প্রতিনিধি শরীফুল আলম সুমন। বিভাগীয় পর্যায়ে সেরা নির্বাচিত ভূঁইয়া নজরুল তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমরা যারা মফস্বলে সাংবাদিকতা করি তাদের নানা সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। তবে দেশ রূপান্তরে কাজ করতে গিয়ে সেই সমস্যাগুলো পাশে ঠেলে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে এ পুরস্কার অনুপ্রেরণা দেবে।’
প্রতিষ্ঠানটির ঢাকায় সেরা তিন কর্মীর মধ্যে প্রথম হন সহসম্পাদক (সম্পাদকীয় বিভাগ) সাঈদ জুবেরী। তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন মোস্তফা মামুন, শাহ আলম বাবুল, আশরাফুল হক রাজীব। দ্বিতীয় সেরা কর্মী বিবেচিত হন বিশেষ প্রতিনিধি পাভেল হায়দার চৌধুরী। তিনি পুরস্কার নেন হারুনের রশিদের হাত থেকে। তৃতীয় সেরা নির্বাচিত হন ফটো বিভাগের মহুবার রহমান। তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন মোহসীনা লাইজু।
প্রথম সেরা নির্বাচিত সাঈদ জুবেরী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘দেশ রূপান্তরে কাজ করতে গিয়ে চিন্তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি। সেরা নির্বাচিত হওয়া অবশ্যই সম্মানের।’ সামনের দিনগুলোতে এ পুরস্কার কাজের উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষদিকে ছিল আকর্ষণীয় র্যাফেল ড্র। তবে এ আয়োজনটি ছিল একটু ব্যতিক্রম। মজার বিষয় হলো, এখানে ১০টি পুরস্কারের সবকটি ছিল দুটি করে। অর্থাৎ ড্রতে যার নাম উঠবে তিনি একটি পুরস্কার রেখে বাকি পুরস্কারটি অন্য একজনকে (নিজের বিভাগ ছাড়া) দিয়ে দিতে পারবেন। আদতে হলোও তাই। ১০ জনের সবাই তাদের একটি করে পুরস্কার তাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠানের প্রিয় মানুষটির হাতে তুলে দেন। সুপারশপ স্বপ্নের সৌজন্যে দুটি গিফট বক্স পান দেশ রূপান্তরের মানবসম্পদ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক (ইনচার্জ) এ টি এম রোবায়েত আলী। তিনি একটি পুরস্কার তুলে দেন দেশ রূপান্তরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোসাম্মাৎ নুরেজা বেগমের হাতে। প্রতিক্রিয়ায় রোবায়েত আলী বলেন, ‘অফিসে সঠিক সময়ে নুরেজা বেগমের উপস্থিতি খুবই ভালো। কর্মী হিসেবেও তিনি খুব দায়িত্বশীল।’ অভ্যর্থনাকারী শামীমা আক্তার তার একটি পুরস্কার তুলে দেন ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের হাতে। অন্য আটজন একইভাবে একটি পুরস্কার নিজের জন্য রেখে অন্যটি তার প্রিয় মানুষকে উপহার হিসেবে দেন।
এরপর র্যাফেল ড্রয়ের গ্র্যান্ড প্রাইজ ওয়ালটনের ৩২ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন পান সহকারী ব্যবস্থাপক অ্যাকাউন্ট্যান্ট আহসান হাবীব।
দেশ রূপান্তরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি সৈয়দ শুকুর আলী শুভ, সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম শামীম, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সুশান্ত কুমার সাহা, কার্যনির্বাহী সদস্য দেলোয়ার হোসেন মহিন ও মো. শরীফুল ইসলাম। এ ছাড়া শুভেচ্ছা জানাতে আসেন প্রাণ গ্রুপের কয়েকজন কর্মকর্তা।
অনুষ্ঠানে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় স্বপ্ন, নিউজিল্যান্ড ডেইরি, ওয়ালটন, মিনিস্টার, রঙ বাংলাদেশ, ডায়নামিক গ্রুপ, কল্লোল, বিশ^ রঙ, পারটেক্স, প্রাণ ফুডস এবং ওমেন কালিনারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।