কবর থেকে তুলে মরদেহ পিষেছে ইসরায়েলি সেনা

ফিলিস্তিনের উত্তর গাজায় একটি হাসপাতালে অভিযানের সময় বুলডোজার দিয়ে রোগীদের মরদেহ বিকৃতির অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে। হুইলচেয়ারে বসা এক ব্যক্তিকে সামরিক প্রশিক্ষিত কুকুর লেলিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পরও একাধিক চিকিৎসককে গুলি করার ঘটনাও ঘটেছে। হাসপাতালের কর্মী ও রোগীরা এসব অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে হাসপাতালটির দুজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসাকর্মী, একজন চিকিৎসক ও একজন রোগীর সঙ্গে কথা বলেছে সিএনএন। তাদের দাবির বিষয়ে ভিডিও প্রমাণাদিও পর্যালোচনা করেছে সিএনএন। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, গত সপ্তাহে কামাল আদওয়ান হাসপাতালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) আট দিনের অভিযান ঘিরে এসব অভিযোগ উঠেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, হাসপাতালটি হামাসের সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

কামাল আদওয়ান হাসপাতালে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, সেনারা যখন হাসপাতাল ভবন ছেড়ে যাচ্ছিল, তারা বুলডোজার দিয়ে সম্প্রতি হাসপাতালের আঙিনায় অস্থায়ী কবরস্থানে দাফন করা মরদেহগুলো খুঁড়ে বের করেছিল।

হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান হোসাম আবু সাফিয়া বলেন, ‘সেনারা বুলডোজার দিয়ে কবর থেকে মরদেহগুলো টেনে বের করে। এরপর সেগুলো বুলডোজার দিয়ে দুমড়েমুচড়ে দেয়। এমন ঘটনা আমি আগে কখনো দেখিনি।’

সিএনএনকে আবু সাফিয়ার সরবরাহ করা ভিডিও ও ছবিতে হাসপাতালের আঙিনায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষের দেহাবশেষ দেখা যায়। একই অভিযোগ করেছেন হাসপাতালটির নার্সিং বিভাগের প্রধান ইদ সাব্বাহ ও আরেকজন নার্স আসমা তানতিশ।

আরেকটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আবু সাফিয়া বলেন, হাসপাতালটিতে নজরদারি করতে ক্যামেরা বেঁধে দিয়ে প্রশিক্ষিত কয়েকটি কুকুর পাঠায় ইসরায়েলি বাহিনী। একটি কুকুর হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা এক বৃদ্ধকে আক্রমণ করে এবং কামড় দেয়।

এদিকে আলজাজিরা এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি অভিযান শুরুর পর থেকে উপত্যকাটিতে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ২০ হাজার। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, দিন যত যাচ্ছে গাজায় হামলা আরও জোরদার করছে ইসরায়েল। সর্বশেষ ৪৮ ঘণ্টায় গাজায় ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে।

আলজাজিরা বলছে, নতুন করে এই হত্যাযজ্ঞ যখন চলছে, তখন যুদ্ধবিরতির পক্ষে-বিপক্ষে জাতিসংঘে কথা চলছিল। গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ করে দিতে সংঘাতে লিপ্ত সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাবও পাস হয়। তবে এই প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতির কথা না বলায় ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই এ প্রস্তাব নিয়ে নিজেদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পর্যাপ্ত নয়। পাঁচ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এ প্রস্তাবটি থেকে যুদ্ধবিরতি বাদ দিয়ে ফাঁকা ও দুর্বল আকারে প্রকাশ করতে কঠোর পরিশ্রম করেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেছে এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আমাদের অসহায় সাধারণ মানুষকে ইসরায়েলের আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে যে চেষ্টা চালাচ্ছে, সেটির বিরুদ্ধে গেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সহায়তা বিতরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

নিরাপত্তা পরিষদে গত সপ্তাহে একটি খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রস্তাবে গাজা উপত্যকায় সংঘাত বন্ধ ও মানবিক ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে আহ্বান জানানো হয় অবিলম্বে ইসরায়েলের সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার।

খসড়া ওই প্রস্তাবে বলা হয়, গাজায় অবিলম্বে সব হামলা বন্ধ করতে হবে, বন্দিদের বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে এবং গাজার সাধারণ মানুষের কাছে বিপুল ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সংঘাতের সব পক্ষকে অবশ্যই তাদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবেÑ তা নিশ্চিত করার কথাও খসড়ায় বলা হয়।