সুদানে হাতে হাতে অস্ত্র

আফ্রিকার দরিদ্র দেশ সুদানে প্রায় আট মাসব্যাপী গৃহযুদ্ধ এখন ব্যাপক নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতির দিকে মোড় নিয়েছে। যুদ্ধরত দুই পক্ষই নিজ নিজ পক্ষে যুদ্ধে নামতে দেশের তরুণদের আহ্বান জানাচ্ছে। তরুণরাও এতে সাড়া দিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে। আবার এর মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, জাতিগত সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনাও চলছে সমানতালে। দেশের পরিস্থিতি এখন এমন যে যত্রতত্র যাকে-তাকে অস্ত্র দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে লড়াইয়ের ময়দানে।

গত ১৫ এপ্রিল সুদানের সেনাবাহিনী এবং আধা সামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতার লড়াইকে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে পড়ে। লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম দেশটিতে চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। উপসাগরীয় দেশগুলো, পশ্চিমা বিশ্ব এবং মুসলিম বিশে^র দেশগুলো সংঘাত নিরসনে উদ্যোগ নিলেও এতে লাভ হয়নি। জাতিসংঘ বলছে, সুদান এখন বিশে^র সবচেয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের বসতি। আরএসএফের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তারা পশ্চিম দারফুরে আফ্রিকার অনারব নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। দুই দশক আগে যেভাবে, সেখানে গণহত্যা চলেছিল, তারই যেন পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে অনারব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ ছিল আরব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

কয়েক বছর আগে সুদানের মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, দেশটি থেকে মনে হয় স্বৈরশাসনের অভিশাপ মুছে যচ্ছে। ২০১৯ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক ওমর আল-বশির। ২০২১ সালে আবারও অভ্যুত্থান হয় দেশটিতে।

উল্লেখ্য, এই বশিরের হাতেই গড়ে ওঠে অভিজাত বাহিনী আরএসএফ, যারা এখন দেশের সেনাবাহিনীকেই শেষ করে দিতে চাইছে। সেনাবাহিনীর প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল বুরহানের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন আরএসএফপ্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালো ওরফে হেমেদতি।

এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৭০ লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এতে নিহত হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ১৯০ জনের মতো। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এরই মধ্যে সতর্ক করেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতির জেরে সুদান আগামী মে মাসে বিপর্যয়কর ক্ষুধার মুখে পড়বে।

১৯৫৬ সালে স্বাধীন হওয়া সুদান কখনোই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীল ছিল না। চলতি সংঘাতের কারণে রাজধানী খার্তুমের রাস্তায় রাস্তায় লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। খার্তুম থেকে পালিয়ে যারা সুদানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ওয়াদ মাদানিতে গিয়েছিল, তারা এখন আবার বিপাকে পড়েছে। কয়েক দিন আগে আরএসএফ শহরটির দখল নেয়। নারীদের ওপর নিপীড়নের খবর পাওয়া যাচ্ছে সেখানে।

সুদানের সেনাবাহিনী আরএসএফকে রুখতে তরুণদের দলে ভেড়াচ্ছে। ওয়াদ মাদানি আরএসএফের হাতে যাওয়ার পর সেনাবাহিনী রিভার নিল রাজ্যে সেনা নিয়োগ কার্যক্রম গতিশীল করেছে। রিভার নিল রাজ্যের শেদনি এলাকার ২১ বছর বয়সী ইয়াসির বলেন, ‘আমি অস্ত্র তুলে নিয়েছি আমাকে বাঁচাতে। আমার জাতিগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে এবং আমার দেশকে রক্ষা করতে। আরএসএফ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তারা বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।’

থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান সুদান ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড পলিসি ট্র্যাকারের প্রতিষ্ঠাতা সুলেইমান বালদো বলেন, ‘সামরিক কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও অনেকে অস্ত্র বহন করছে এবং তারা দ্রুতই মারা পড়ছে।’