সমন্বয় হলে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজারে মিলবে হার্টের রিং

দেশে হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত রিংয়ের (স্টেন্ট) সরকারনির্ধারিত নতুন দামের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তিন কোম্পানিকে সুবিধা দিতে দাম নির্ধারণে বৈষম্য করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনেছে ইউরোপের ২৪টি কোম্পানির রিং সরবরাহকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তারা ‘বৈষম্য’ নিরসন করে দাম সমন্বয় না করা পর্যন্ত হাসপাতালে রিং সরবরাহ করবে না বলেও জানিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের তিন কোম্পানির ক্ষেত্রে মার্কআপ ফর্মুলা মানা হয়েছে। তবে ইউরোপের ২৪টি কোম্পানির রিং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে রিংয়ের মূল্য নির্ধারণে এই নিয়ম মানা হয়নি। এমনকি দাম নির্ধারণে প্রতিবেশী দেশ ভারতের নিয়মও মানা হয়নি। অথচ সঠিকভাবে সমন্বয় করা হলে দেশে হার্টের রিংয়ের দাম সর্বোচ্চ ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার এ নিয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। কিন্তু সেখানে দাম সমন্বয়ের কোনো আশ্বাস পাননি তারা। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর বিষয়টি নিয়ে বসবেন তারা।

এ ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, কারও অভিযোগ থাকলে আলোচন করার সুযোগ রয়েছে। জাতীয় মূল্য নির্ধারণ কমিটির ১৩ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে, আলোচনা করে বৈঠকের তারিখ জানানো হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওয়াসিম আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঔষধ প্রশাসনের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় মূল্য নির্ধারণ কমিটি বসতে চায় না। তবে আমরা ঔষধ প্রশাসন যখন বসতে বলবে, তখনই বসতে রাজি।’

এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, ‘রিংয়ের দাম সমন্বয় হলে দেশে সব ধরনের হার্টের রিং ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে পাবে মানুষ। তবে সব কোম্পানিকে একই দামে রিং বিক্রি করতে হবে। এটি সমন্বয় করবে ঔষধ প্রশাসন।’

এদিকে দাম নির্ধারণে বৈষম্যের প্রশ্ন তুলে রিং সরবরাহকারীদের একটি অংশ রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। সঠিক আকৃতির রিং না পাওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে একদিকে যেমন রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে দ্বিগুণ টাকা দিয়ে রিং কিনতে হচ্ছে স্বজনদের; বিশেষ করে গরিব রোগীদের চিকিৎসা না নিয়েই ফিরতে হচ্ছে। সংকট নিরসনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হৃদরোগ বিভাগ থেকে উপাচার্যের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

১২ ডিসেম্বর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ ইউসুফ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ২৭ কোম্পানির ৪৪ ধরনের হার্টের রিংয়ের দাম বেঁধে দেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর এই দাম কার্যকর হয়। এরপর হার্টের রিংয়ের দাম নির্ধারণে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে ইউরোপের ২৪টি রিং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ধর্মঘট ডাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধর্মঘটের আগে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দৈনিক ৩৫ থেকে ৪০ জন হৃদরোগীর হার্টে ইউরোপের কোম্পানিগুলোর রিং বাসানো হলেও বর্তমানে তা দৈনিক ২০ থেকে ২৫টিতে নেমে এসেছে। আর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে দৈনিক ৪০ জন রোগীর হার্টে রিং বাসানো হলেও বর্তমানে ২০ জন রোগীর হার্টে রিং বসানো হচ্ছে। একই অবস্থা বিএসএমএমইউতেও। দৈনিক ১৫ থেকে ২০টি রিং পরানো হলেও বর্তমানে তা কমে ৮-১০টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। রিংয়ের আকৃতি না মেলার কারণে রোগী ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

কার্ডিয়াক মেডিকেল ডিভাইসের মূল্য নির্ধারণ কমিটির দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দাম নির্ধারণী সভায় তারা ছিলেন না। এ ব্যাপারে তাদের কিছু বলাও হয়নি।

ব্যবসায়ী নেতারা অভিযোগ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাবোট ল্যাবরেটরিজ, বোস্টন সায়েন্টিফিক, মেডট্রোনিক কোম্পানির ছাড়া বাকি কোম্পানিগুলোর রিংয়ের দাম নির্ধারণে মার্কআপ ফর্মুলা অনুসরণ করা হয়নি। দাম নির্ধারণে এই তিন কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ১২ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করল। বলল ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। মাঝখানে দুদিন ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর সরকারি ছুটি। পুরনো স্টক রয়েছে। সেগুলো তো নির্ধারণ করে দেওয়া দামে বিক্রি সম্ভব নয়। ক্ষতি গুনতে হবে। আগে আমদানি করা রিং বিক্রির জন্য সময় দিতে হবে। সেটাও দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের যে তিন কোম্পানির রিংয়ের দাম নির্ধারণ করেছে, তার মধ্যে কাউকে পুরনো আমদানি করা রিং বিক্রির জন্য তিন মাস ও কাউকে ৪৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। ওরা যে মাত্র পুরনো রিং শেষ করে নতুন রিং এনেছে, তখনই দাম নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তিন কোম্পানির রিংয়ের মধ্যে একটি কোম্পানির সর্বনিম্ন মূল্য ৬৬ হাজার, একটি কোম্পানির ৭৩ হাজার ও সর্বোচ্চ দুটি কোম্পানির একটির মূল্য ৯৩ হাজার ও আরেকটির সর্বোচ্চ মূল্য ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা। বাকি ২৪ কোম্পানির মধ্যে সর্বনিম্ন ৪৫ হাজার ও সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার টাকা।

ব্যবসায়ীরা জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই দাম কমানো হয়েছে। নির্দেশনা ছিল দাম কমাতে হবে এবং ভারতের সমকক্ষ হতে হবে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর তখন বলেছে ভারতের কাছাকাছি সমন্বয় করেছে তারা। ভারতের সমকক্ষ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের রিং সেখানে ২৭ হাজার ও ৪০ হাজার রুপি, বাকি দেশগুলোর রিং ৪০ হাজার রুপি। এখানে সব মিলে গড়ে ৪০ হাজার রুপি করা যেত। এতে ব্যবসায়ীদের সাড়ে ৭ শতাংশ লভ্যাংশসহ আমদানির খরচ উঠে আসত। এভাবে সমন্বয় করলে গড়ে বাংলাদেশে হার্টের রিংয়ের দাম ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে হবে। এখন যেটার দাম সর্বনিম্ন ৬০-৬৬ হাজার, সেটা হবে ৬০ হাজার ও সর্বোচ্চ হবে ৮০ হাজার টাকা এই দুই ফরম্যাটে হতে পারে। ভারতে যদি ৪০ হাজার রুপি হয়, যেটা বাংলাদেশে ৫৬ হাজার টাকা হবে। অথচ সেটার দাম এখন করা হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এভাবে ভারতের চেয়ে তিন গুণ বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের যে দুটি কোম্পানির রিংয়ের দাম কমিয়ে ৬৬ হাজার ও ৭৩ হাজার টাকা করা হয়েছে, সেগুলো ২০ বছর আগের প্রযুক্তির। কিন্তু বাকি দুটি রিংয়ের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়ানো হয়েছে। অথচ ইউরোপের কয়েকটি দেশ ও ভারতের কিছু কোম্পানির রিংয়ের দাম ৬৫ হাজার টাকা করতে পারে। বাকি যেগুলো আধুনিক প্রযুক্তির, সেগুলো ৮০ হাজার টাকা করতে পারে। আর এটা করলে সবাই সন্তুষ্ট থাকবে।