মেহেরপুরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের নৌকা প্রতীকের পক্ষ না নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে ভোটের মাঠে কাজ করায় কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সংরক্ষিত নারী সদস্য রহিমা খাতুনকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ উঠেছে পরিষদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। গতকাল বুধবার সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম রেজা চড়াও হয়ে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে পরিষদের সভাকক্ষ বের করে দেন বলে জানিয়েছেন রহিমা। তিনি ওই ইউপির ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য।
এ ঘটনার পর সংবাদ সম্মেলন করেন রহিমা খাতুন। সেখানে তিনি বলেন, ‘মেহেরপুর-১ আসনে নৌকা মনোনীত প্রার্থী ফরহাদ হোসেনের পক্ষে ভোট করছেন কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম রেজা। আর আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আব্দুল মান্নানের (ট্রাক প্রতীক) পক্ষে এলাকায় ভোট করছি। আজ ইউনিয়ন পরিষদের সভা চলাকালে চেয়ারম্যান সেলিম রেজা সব সদস্যকে নৌকার পক্ষে নির্বাচনী মাঠে নামার জন্য দাঁড়িয়ে শপথ করান। এ সময় আমি শপথে অংশ না নিলে চেয়ারম্যান অকথ্য ভাষায় গালি দিতে দিতে তেড়ে আসেন। সেলিম রেজা গালি দিয়ে চিৎকার করে বলেন, ‘তুই আর তোর ভাই বাড়িতে ট্রাকের অফিস করেছিস। গ্রামে ট্রাকের পক্ষে ভোট চাচ্ছিস। তুই জাতির শত্রু, আমাদের সবার শত্রু।’ উত্তরে আমি বলি, চেয়ারম্যান সাহেব আপনি আওয়ামী লীগ করেন, আমিও আওয়ামী লীগ করি। নির্বাচনে আপনি নৌকা বেছে নিয়েছেন, আমি ট্রাক বেছে নিয়েছি। আপনার সমস্যা কি? তখন চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, ‘তুই মিটিং থেকে বের হয়ে যা।’ আমি বের না হলে চেয়ারম্যান ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে আমাকে বের করে দেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে সভাকক্ষ থেকে বের হই।’ ঘটনাটি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে জানানোর পর বিচার চেয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন বলে জানান রহিমা।
এ ছাড়া তিনি প্রতিকার চেয়ে মেহেরপুর সদর থানায় এবং নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান।
এ প্রসঙ্গে মেহেরপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লাভলি ইয়াসমিন বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে ভোট না করায় চেয়ারম্যান সেলিম রেজা নারী সদস্যের গায়ে হাত তুলেছেন। এটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ। রহিমার অভিযোগ শুনে আমরা সাংগঠনিকভাবে প্রতিবাদ করছি। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই। বিচার না পেলে পরিষদ ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।’
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা ডাবু হোসেন বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের পাশের দোকানে বসে ছিলাম। হঠাৎ দেখি নারী মেম্বার পরিষদ থেকে বের হয়ে কান্নাকাটি করছেন। আমরা কিছু লোক গিয়ে দেখি চেয়ারম্যান তাকে হুমকি দিচ্ছেন।’
কুতুবপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রাজন আলী বলেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেব সব মেম্বারদের ডেকেছিলেন। এর মধ্যে রহিমা খাতুনকে বলেন, ‘তুমি এবং তোমার ভাই নৌকার বিরুদ্ধে ট্রাকের অফিস করে নির্বাচন করছ কেন।’ এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে চেয়ারম্যান রহিমা মেম্বারকে বলেন, ‘তুই আর ইউনিয়ন পরিষদে আসবি না, তুই পরিষদ থেকে বের হয়ে যা।’
মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল মান্নান (ছোট) বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সেইসঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এ ঘটনার বিচার দাবি করছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম রেজা বলেন, ‘দুপুরে পরিষদে মাসিক সমন্বয় মিটিং চলছিল। এ সময় নারী ইউপি সদস্য রহিমা খাতুন নানা বিষয়ে অযৌক্তিক প্রশ্ন করে নিজেই উত্তেজনা ছড়ায়। আমি স্বাভাবিকভাবে কথা বলার আহ্বান করলে সে মিটিং ছেড়ে বাইরে চলে যায়। পরে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে সাংবাদিকদের কাছে বক্তব্য দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি মহল নির্বাচন কেন্দ্র করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। কারণ আমি নৌকার পক্ষে ভোট করছি। আমি আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে মেহেরপুর সদর থানার ওসি শেখ কনি মিয়া বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। আমি অফিসে ছিলাম না। নারী ইউপি সদস্য রহিমা খাতুন থানার ডিউটি অফিসারকে একটি অভিযোগপত্র দিয়ে গেছেন। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শামিম হাসান জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তিনি পাননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।